বেক্সিমকোতে বিনিয়োগ করে বিপুল লোকসান আইএফআইসি ব্যাংকের

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৫২ এএম

বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও বন্ডে বিনিয়োগ করে বিপুল পরিমাণে লোকসানে পড়েছে বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি। ২০২৩ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন ব্যাংক ও বন্ডে আইএফআইসি ব্যাংকের বিনিয়োগ ছিল তার দুই-তৃতীয়াংশই করা হয়েছে বেক্সিমকোর বিভিন্ন কোম্পানিতে, যেটির মালিক সালমান এফ রহমান, যিনি একই সঙ্গে আইএফআইসি ব্যাংকেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। পুঁজিবাজারে নিজের কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়াতে আইএফআইসি ব্যাংককে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে সালমানের বিরুদ্ধে।

২০২৩ সালের আইএফআইসি ব্যাংকের নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও বন্ডে আইএফআইসি ব্যাংকের বিনিয়োগ ছিল ৬৬৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যার মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপভুক্ত কোম্পানির শেয়ার ও বন্ডে বিনিয়োগ হয় ৪৪৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এটি আইএফআইসি ব্যাংকের পুঁজিবাজারে থাকা মোট বিনিয়োগের ৬৭ শতাংশ। বর্তমানে বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানিগুলোতে থাকা বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৬১ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানিতে থাকা আইএফআইসির বিনিয়োগের ৩৬ শতাংশের বেশি লোকসান হয়েছে। এ লোকসান শুধু বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইসতিসনায়।

বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হলে ব্যাংকটির লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ ইতিমধ্যেই বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারের আয়ে বড় ধরনের পতন হয়েছে। এ ছাড়া গ্রুপটির কর্ণধার সালমান এফ রহমান বিভিন্ন মামলায় বর্তমানে জেলে আছেন এবং আর্থিক পরিস্থিতি খারাপ থাকায় বেক্সিমকো লিমিটেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করা হচ্ছে। ফলে এ শেয়ারটিতে বিনিয়োগে কাগজে-কলমে মুনাফা থাকলেও লেনদেন চালু হলে শেষ পর্যন্ত তা লোকসান বয়ে আনবে।

বেক্সিমকো গ্রুপের শেয়ারগুলোতে আইএফআইসি ব্যাংকের বিনিয়োগও স্বার্থের দ্বন্দ্ব (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি করেছে। বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান। একই সঙ্গে তিনি আইএফআইসি ব্যাংকেরও চেয়ারম্যান। ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান, যিনি সালমান এফ রহমানের ছেলে ও বেক্সিমকো গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদের উপদেষ্টা। উভয় প্রতিষ্ঠানের এমন স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকার পরও আইএফআইসি ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সিংহভাগই করা হয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের শেয়ারগুলোতে। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ শেয়ার কেনা হয়েছে উচ্চমূল্যে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আইএফআইসি ব্যাংকের সবচেয়ে বেশি লোকসান হয়েছে বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইসতিসনায়। ব্যাংকটি ২৮৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে বেক্সিমকোর সুকুকে। এ ক্ষেত্রে শুরুতে ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যে ৮০ কোটি টাকার সুকুক কেনে। সর্বশেষ বেক্সিমকো সুকুক বন্ডের মূল্য নেমে এসেছে ৫০ টাকায়। এতে এ বিনিয়োগেই লোকসান হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। পরে সেকেন্ডারি বাজার থেকে আরও ২০৯ কোটি টাকার সুকুক কেনা হয়, যার ক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ৮৫ টাকা ৭৯ পয়সায়। যেখানে লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বেক্সিমকো সুকুকে আইএফআইসি ব্যাংকের লোকসান ১২৭ কোটি টাকা।

বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে আইএফআইসি ব্যাংকের বিনিয়োগ ১১০ কোটি টাকা। মোট ১ কোটি ৪ লাখেরও বেশি শেয়ার কেনা হয়েছে ১০৫ টাকা দরে। সর্বশেষ লেনদেন দিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) শেয়ারটির দর কিছুটা বেড়ে ৭৩ টাকা ৩০ পয়সায় উন্নীত হয়। এ শেয়ারে বিনিয়োগ করে আইএফআইসি ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা।

২০২০ সালে আইএফআইসির কাছে বেক্সিমকো লিমিটেডের ১ কোটি ৮১ লাখ ৯৩ হাজার শেয়ার ছিল, যার গড় ক্রয়মূল্য ছিল ৪৩ টাকা ৭২ পয়সা। পরের বছর কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারটির দাম ১৪৮ টাকায় উন্নীত হলে বেশিরভাগ শেয়ার বিক্রি করে ব্যাংকটি। এতে সে বছর এ শেয়ার থেকে বিপুল পরিমাণে মুনাফা হয়। তবে পরবর্তীকালে প্রায় ৪৬ লাখ শেয়ার প্রায় ১০০ টাকা মূল্যে কেনা হলেও ফ্লোর প্রাইসের কারণে এ বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হলে এ শেয়ারটি থেকেও বিপুল লোকসান নিতে হতে পারে বলে ধারণা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত