৭০ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর না ফেরার দেশে কাউসার

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ১০:৩৫ পিএম

চট্টগ্রামে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির বিবিএর প্রাণবন্ত শিক্ষার্থী কাউসার মাহমুদকে (২২) হারানোর যন্ত্রণায় স্তব্ধ লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জসহ ভাটরার একাধিক গ্রাম। নগরের নিউমার্কেট এলাকায় গত ৪ আগস্ট পুলিশের ছোড়া টিয়ারশেলে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে যাওয়ার পর ছাত্রলীগেরর মারধরে গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি।

দীর্ঘ ৭০ দিন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তরতাজা এই তরুণ থেমে যান গতকাল রবিবার রাতে। হার মানলেন মৃত্যুর কাছে। এ সময় তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। গ্রামের বাড়ি লক্ষীপুর হলেও তার বাবা আবদুল মোতালেব পরিবার নিয়ে থাকেন নগরের মোগলটুলী এলাকায়। সেখানকার আব্দুর রহমান মাতব্বর জামে মসজিদের পাশে কবরস্থানে কাউসারকে দাফন করা হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

আহত হওয়ার দুদিন আগে (২ আগস্ট) নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনের ছবি দিয়ে কাউসার মাহমুদ তার শেষ স্টাটাসে লিখেছিলেন, ‘আসছে ফাগুন দ্বিগুণ নয়, ১৬ কোটি হবো।’  মো. সাইয়িদ নামে তার এক সহপাঠী বলেন, ‘১৬ কোটি নয়, দেশের ১৮ কোটি মানুষের মনে ফাগুন লাগিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল কাউসার।’ তার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নে।

রবিবার রাতে কাউসারের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর থেকে  গ্রামের বাড়ি রামগঞ্জসহ চট্টগ্রাম নগরের মোগলটুলি এলাকায় শোকের নহর বয়ে যাচ্ছে। তার মৃত্যুতে চোখে পানির বান ধরে রাখতে পারছেন না কেউ। শুধুই কাঁদছেন বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনেরা। খবর নিয়ে জানা গেছে, কাউসারের জানাজায় অংশ নিতে তার গ্রামের বাড়ি লক্ষীপুরের রামগঞ্জ থেকে অনেক আত্মীয়-স্বজন এসেছেন মোগলটুলীতে।

কাউসার পড়ালেখা শেষ করে একদিন বড় মানুষ হবে এমনটাই স্বপ্ন দেখছিলেন তার বাবা আবদুল মোতালেব। সোমবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে মোবাইল ফোনে কল করে সংবাদকর্মী পরিচয় দিলে অপরপ্রান্তে ডুকরে কেঁদে উঠেন মোতালেব। “তারে নিয়া অনেক স্বপ্ন ছিল আমার। আশায় ছিলাম হাসপাতালের শয্যা থেকে ফিরে এসে আমাকে আব্বু বলে ডাক দিবে। এখন কিন্তু  সব শেষ” বলেন মোতালেব।

গেল ৯ আগস্ট ছিল কাউসার মাহমুদের ২২তম জন্মদিন। সেদিন ফেসবুকে জন্মদিনের কেক ও চিকিৎসাধীন কাউসারের ছবি পোস্ট করে তার ছোটভাই সুলতান মাহমুদ লিখেন, “হেপি বার্থ ডে ভাইয়া। আজ দুই মাস ১০ দিন হয়ে গেলো ভালো করে কথা বলতে পারি না। তোর সঙ্গে একদিন ঝগড়া না করলে ভালো লাগে না। কিন্তু আজ কতদিন তোর সঙ্গে কথাই বলতে পারি না।”

জানা গেছে, নগরের নিউমার্কেট এলাকায় ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন কাউসার। গত ৪ আগস্ট নিউমার্কেট এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের ছোড়া গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কাউসার। এ সময় ছাত্রলীগ-যুবলীগ কমীর্দের বেধড়ক পিটুনিতে কিডনিতে আঘাত পান। কিন্তু রাতে বাসায় গিয়ে পরিবারের কাউকে কিছুই জানাননি কাউসার। সেদিন রাতে খিঁচুনি আসে তার।

পরদিন ৫ আগস্ট নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কাউসারকে। চিকিৎসকরা জানান—মারধরে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত কাউসারের দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। দুই সপ্তাহ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন কাউসার। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে কাউসারকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। অবশেষে ৭০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত রবিবার রাতে মারা যান কাউসার মাহমুদ।

এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে জানানো হয়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী কাউসার মাহমুদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে আগের দিন তাকে চট্টগ্রাম সিএমএইচে স্থানান্তর করা হয়। পরে চট্টগ্রাম সিএমএইচের সহযোগিতায় ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আর্মি অ্যাভিয়েশনের হেলিকপ্টারে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা সিএমএইচে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে স্থানাস্তর করা হয়।

গতকাল রবিবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেন চট্টগ্রাম বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী কাউসার মাহমুদ। উত্তাল সেই আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোড়া গুলি তার শরীরে লাগে। দীর্ঘদিন লড়াই করে ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাউসার মাহমুদ শাহাদাত বরণ করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত