দেশের মানুষের বড় একটা অংশের কাছে মাছ-মাংস এখন বিলাসী পণ্য। আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে অনেকের পাত থেকে বাদ পড়েছে মাছ, মাংস ও ডিমের মতো আমিষযুক্ত খাবার। গেল কিছুদিন ধরে সবজির দামও অনেকের নাগালের বাইরে। বৃষ্টি-বন্যার অজুহাতে আলু আর পেঁপে ছাড়া বাকি প্রায় সব সবজির দাম ১০০ টাকার বেশি। কোনো কোনো সবজি বাজারভেদে ১৫০-২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সরকারের কোনো উদ্যোগই লাগাম পরাতে পারছে না নিত্যপণ্যের বাজারে। কিছুদিন ধরে দামের পাগলা ঘোড়ায় সওয়ার হয়েছে ভর্তার উপকরণগুলোও। এক মাসের ব্যবধানে আলু ছাড়া ধনেপাতা, কাঁচা মরিচ, বেগুন, বরবটি, বিলাতি ধনেপাতার দাম বেড়েছে দুই গুণের বেশি।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শেষ দুই সপ্তাহে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছে ১৭২ শতাংশ, বিলাতি ধনেপাতা ৫০ শতাংশ, বেগুন ১৪০ শতাংশ, বরবটি ১১৪ শতাংশ, পেঁয়াজ ১৮ শতাংশ ও দেশি ধনেপাতার দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত।
সোমবার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ভর্তার অন্যতম উপকরণ কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে। অথচ মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই খুচরা বাজারে কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে। মরিচের মতো ভর্তার অন্যান্য উপকরণের মধ্যে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৩০, কেজিতে ৩০০ টাকা বেড়ে দেশি ধনেপাতা বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০, বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ২৪০ টাকা দরে। বরবটি ১৩০ থেকে ১৫০, ২০০ টাকা বেড়ে বিলাতি ধনেপাতা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
হঠাৎ করে ভর্তার উপকরণগুলো দাম বৃদ্ধির বিষয়ে খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারদের দুষছেন। অন্যদিকে পাইকাররা বৃষ্টি ও বন্যার অজুহাত দিচ্ছেন। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকার ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। ফলে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ে। আর পাইকারা বলছেন, বন্যার কারণে অনেক অঞ্চলের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজারে সরবরাহ কমেছে। তাছাড়া কৃষক তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মাঠেই ফসলের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। সব মিলিয়ে কাঁচাবাজারে চড়া দামের প্রভাব বিদ্যমান।
কারওয়ান বাজারের ধনেপাতার পাইকারি বিক্রেতা মুজাহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের অন্য কোনো ব্যবসায়ীর কাছে ধনিয়া না থাকলেও আমার কাছে মৌসুম ছাড়াও ধনেপাতা পাওয়া যাবে। কিন্তু এবার দেশের নানাপ্রান্তে বন্যার পানিতে অনেক ফসল নষ্ট হয়েছে। কিছু এলাকা থেকে ধনিয়া পাওয়া গেলেও তা চড়া দামে মাঠেই বিক্রি করছেন কৃষক। অন্যদিকে ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ধনেপাতার দাম একটু বেশি।
এদিকে ভর্তার অন্যতম আরেক উপাদান শুঁটকির বাজার ঘুরে দেখা যায়, সব ধরনের শুঁটকি আকাশছোঁয়া দামে বিক্রি হচ্ছে। এক হাজার টাকার নিচে কোনো শুঁটকি নেই। প্রতি কেজি পাতা শুঁটকি কিনতে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকা। লইট্ট্যা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০, পুঁটি শুঁটকি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৭০০, চেলা শুঁটকি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০, চিংড়ি শুঁটকি ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ও প্রতি কেজি কাঁচকি শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়।
ভর্তার উপকরণের দাম বাড়ায় হোটেল রেস্তোরাঁতেও এর প্রভাব পড়তে দেখা গেছে। কিছু কিছু হোটেলে দাম এক থাকলে আকার ও পরিমাণের ভর্তা অর্ধেকে নেমেছে। আবার কিছু কিছু রেস্তোরাঁয় আকার ও পরিমাণ ঠিক থাকলেও দাম বেড়েছে। এ নিয়ে ক্রেতা—বিক্রেতা ব্যাপক বিড়ম্বনায় রয়েছেন। গতকাল সোমবার মতিঝিল এলাকার হোটেল—রেস্তোরাঁয় ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়।
বাফুফে ভবনের পাশের এক ভাসমান হোটেলে দুপুরের ভাত খেতে এসে রিকশাচালক মনু মিয়া আলুভর্তার আকার দেখে সার্ভিস বয়ের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ালেন। ভর্তার আকার দেখে তিনি হোটেল মালিককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ভর্তার আকার ছোট কেন? এই ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়া যায়? মাছ—মাংসের বেশি দাম বলেই ভর্তা দিয়ে ভাত খাই। তাও যদি ছোট হইয়া যায়, তাইলে বাইছা থাকমু কীভাবে?’
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের মূল্যস্ফীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু আমরা অনেক আগে থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বলে আসছিলাম। এর জন্য আমাদের রাজস্বনীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা, সময় অনুযায়ী আমদানি, মজুদ ও সরবরাহ করার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনার অন্যান্য দিকেও নজর দিতে হবে। তাছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য ভোক্তা অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্য উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত দামের ওপর নজরদারি থাকতে হবে।’
সরকারের কড়া সমালোচনা করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শুধু বলেই যাচ্ছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। আমাদের দেশে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে ওঠার জন্য সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। সরকার আন্তরিক নয় বলে বিভিন্ন সময় আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের পুরো সুবিধাই ব্যবসায়ীরা নিয়েছিলেন। সাধারণ জনগণ এর কোনো সুবিধা পাননি।’
কাল থেকে আলু ৩০, ডিম ডজন ১৩০, পেঁয়াজ ৭০ টাকা
শেখ হাসিনাকে কবে ফেরত চাইবে বাংলাদেশ?
৭০ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর না ফেরার দেশে কাউসার
মেয়র পালিয়ে ভারতে, ময়লার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ পৌরবাসী
নিহতের ৫২ দিন পর হত্যা মামলার আসামি খতিব