নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত জমি নিয়ে বিরোধের জেরে একই পরিবারের আট সদস্য খুন হয়েছেন। ওই পরিবারের বাকি দুই সদস্য এখন নিরন্তর ভয় ও যন্ত্রণা নিয়ে বসবাস করছেন। এদের মধ্যে ২০০৩ সালেই নিহত হন চারজন। সর্বশেষ ভিকটিম মনিরুজ্জামান মনুকে চলতি বছরের ৭ জুন মুরাদপুরে তার বাড়িতে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
নিহত মনিরুজ্জামানের স্ত্রী সাবিনা বেগম আত্মীয়-স্বজনদের হারিয়ে এখন বিচারের আশায় আছেন। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রতিবেশী নুর হাজী পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তিনি। মূলত ৪০ ডেসিমেল জমি নিয়ে এই বিরোধের সূত্রপাত।
গত ৮ জুন সাবিনা বাদী হয়ে বন্দর থানায় মনির, মিঠু, টিটু, মোহাম্মদ ফারুক, তাদের বাবা নুর ওরফে নুর হাজী, কাওসার, নাঈম, ফরহাদ, ফয়সাল, রায়হান, নুরুল, মোজাম্মেল, ইউনুস ও জনির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, প্রাণভয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে গাজীপুর ও নরসিংদীতে বসবাস করছিলেন মনু। গত ৬ জুন মনু তার খালার মৃত্যুর পর স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সোনারগাঁওয়ের কুতুবপুরে তাদের বাড়িতে যান। তার পরিবার মুরাদপুরে তাদের বাড়িতে ফিরে গেলে, মনু ঢাকার ডেমরায় এক বন্ধুর বাড়িতে যান। তবে পরদিন সকালে তিনি মুরাদপুরের বাড়িতে ফিরে আসেন।
তার উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা সকাল ১১টার দিকে বাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং তাকে জোর করে তার ঘর থেকে বের করে এনে গুলি চালায়। তারা তাকে নির্বিচারে মারধর করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা করে।
নিহতের বোন শাহিনা আক্তার বলেন, পুলিশ সন্দেহভাজন ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে; এদের মধ্যে ফরহাদ ও ফয়সাল দুজন নারায়ণগঞ্জ আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করেন।
তিনি জানান, তার বাবা কামাল উদ্দিন বিদ্যুতের অফিসে কর্মরত একজন সরকারি কর্মচারী এবং বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে নুর হাজী পরিবারের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা ছিল। ১৯৮৯ সালের এক সন্ধ্যায় শাহিনার মা ফুলমতি বেগমকে তাদের রান্নাঘর থেকে নূর হাজীর সাথে সম্পর্কিত এক নারী ডেকে নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, পরের দিন মুরাদপুর কবরস্থানে আমার মায়ের লাশ পাওয়া যায়। খুনিরা তার মাথায় তিনবার ছুরিকাঘাত করেছে। তখন, আমরা বুঝতে পারিনি যে নূর হাজী পরিবার আমার মাকে হত্যার জন্য দায়ী। কিন্তু আমরা অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত মামলাটি স্থগিত করা হয়।
মাকে হত্যার ঠিক এক বছর পর নূর হাজীর বাড়ির সামনের রাস্তায় একটি গাড়ির ধাক্কায় তার বাবা কামাল উদ্দিন নিহত হন। ২০০৩ সালের ১০ এপ্রিল নূর হাজীর ছেলেরা এবং অন্যরা মিলে তার দুই ভাই মোহাম্মদ বাবুল ও নুরুজ্জামানকে মুরাদপুরে তাদের বাড়ির কাছে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে।
শাহিনা জানান, এ ঘটনায় সুরত আলী, রব, হাবিব, আব্দুল মালেক, আব্দুল জলিল, আমান, তালু ও আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় জোড়া খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, নূর হাজীর ছেলে এবং আত্মীয়রা তার বোন রেহেনা আক্তারকে ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অপহরণ করে নিয়ে যায় যার খোঁজ এখনও অজানা। এ ঘটনায় হাবিব, মিঠু, জাবেদ, রনি ও কাবিলের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় মামলা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ওই বছরের অক্টোবরে নুরহাজীর ছেলে ও আত্মীয়রা মদনপুর স্ট্যান্ড থেকে নিলুফা আক্তার নামে আরেক বোনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে নোয়াপুরে তার লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনার পর ২০০৩ সালের ৫ অক্টোবর বন্দর থানায় নূর উদ্দিন, জাবেদ, হাবিব, রনি, আমান, কাবিল, সালাউদ্দিন, সফিউদ্দিন ও আলী আহমেদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যা এখনও বিচারাধীন।
এরপর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শাহিনার বড় ভাই আবুল হোসেন তথাকথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন। নুর হাজী পরিবার পরিকল্পিত এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে সন্দেহ করেন শাহিনা। তিনি বলেন, পুলিশ নূর হাজী পরিবারের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান নামে আরেক ভাইকে গ্রেপ্তার করেছিল। পরে ২০১১ সালের ২৫ নভেম্বর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি স্ট্রোক করে মারা যান।
বর্তমানে শাহিনা তার বেঁচে থাকা একমাত্র বোন সেলিনাকে নিয়ে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছেন।
শাহিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুরাদপুরে আমাদের বাড়ি নূর হাজী পরিবার পুড়িয়ে দিয়েছে। হত্যার ভয়ে আমরা বাড়ি ফিরতে পারি না। এসব ঘটনায় তারা দুটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে তিনি নিহতদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
শেখ হাসিনা যে কাজ করেছে, সেই কাজ আমরা করব না
জেড আই খান পান্নার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলায় আসকের নিন্দা