চলমান রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে নতুন মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার সেনা রয়েছে এবং তাদের কাছে তার প্রমাণও আছে। উত্তর কোরিয়া ছাড়াও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধকে অব্যাহতভাবে সমর্থন করছে আরও দুই মিত্র ইরান ও চীন। বিশ্লেষকদের শঙ্কা, রাশিয়ার প্রতি উত্তর কোরিয়া, ইরান ও চীনের এমন সমর্থন বিশ্বে ‘নতুন অক্ষশক্তি’ তৈরি করছে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের বরাতে সিএনএনের নিবন্ধে বলা হয়, ইউক্রেনে মস্কোর যুদ্ধক্ষেত্রকে শক্তিশালী করতে উত্তর কোরিয়ার হাজার হাজার সেনা রাশিয়ায় মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন প্রথমবারের মতো রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার সেনা পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া যদি ইউক্রেনে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করে, যেমনটা কিয়েভ অভিযোগ করেছে, তবে এটি অনেক অনেক গুরুতর বিষয়। এটি কেবল ইউরোপেই নয়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও প্রভাব ফেলবে।’
নিবন্ধে আরও বলা হয়, শত শত ইরানি ড্রোনও ইউক্রেনের যুদ্ধে মস্কোর আক্রমণের অংশ ছিল। এ ছাড়া গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তেহরান ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধরত দেশটিকে স্বল্প-পরিসরের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও পাঠিয়েছে। এতে সিএনএনের নিবন্ধে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অভিন্ন বিদ্বেষ এসব দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে প্ররোচিত করছে, যা শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে না বরং বিশ্বে ‘নতুন অক্ষশক্তি’ তৈরি করছে। এদিকে যুদ্ধে রাশিয়াকে মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স এবং মেশিন টুলসের মতো প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে চীনের বিরুদ্ধে। তবে তিনটি দেশই এ ধরনের সহায়তা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশল মূল্যায়নকারী কংগ্রেস সমর্থিত একটি গ্রুপ রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে ‘ক্রমবর্ধমান ক্ষতিকর অংশীদারত্বের অক্ষ’ বলে অভিহিত করেছে।
চীন ফ্যাক্টর : পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই জোট কীভাবে বিকশিত হয়, তার একটি মূল ফ্যাক্টর হচ্ছে চীন। দেশটি এই গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়। রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এ দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে বৈরিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেইজিং বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে। যার একটি উদাহরণ চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কাজানে প্রদর্শিত হয়েছে। যেখানে শি এবং পুতিন ব্রিকস গ্রুপের একটি শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে একটি ‘ন্যায্য’ বিশ্ব গড়ার জন্য প্রতিশ্রুতির কথা ব্যক্ত করেছেন।
সত্যিকারের ঝুঁকি : গত জুলাইয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা কৌশল মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকা কমিশন অন দ্য ন্যাশনাল ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি বলেছে, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব অন্তর্ভুক্ত করতে চীন ও রাশিয়ার অংশীদারত্ব ‘গভীর ও বিস্তৃত’ হয়েছে।
এতে বলা হয়, মার্কিন স্বার্থবিরোধী দেশগুলোর এই নতুন সমন্বয় একটি বাস্তবঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে সংঘাত বহুপক্ষ বা বৈশ্বিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। তবে চীন বারবার জোর দিয়ে বলেছে, রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক ‘সংঘাতহীন’ এবং কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করে না।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো টং ঝাও বলেন, ‘রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও ইরান এমন একটি পক্ষ যার সঙ্গে চীন খোলাখুলিভাবে যুক্ত হতে চায় না।’ তিনি বলেন, চীন এটি স্পষ্ট করতে মরিয়া যে, তাদের সম্পর্ক রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় জোট নয়।’
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সিডনি সেইলারের মতে, প্রথমত, চীনের পক্ষ থেকে ‘আরও কিছু মধ্যপন্থি আচরণ’ প্রত্যাশা করা যেতে পারে। তবে বর্তমানে যে অবস্থা তাতে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে হুমকির মুখোমুখি হতে পারে বলে ‘যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে’, জানান তিনি।
