বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে হত্যাকাণ্ডসহ সামগ্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কাজ করছে জাতিসংঘ। আগস্টে প্রথমে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং দল বাংলাদেশ সফর করে। মূলত কতদিন কাজ করবে, সরকারের প্রত্যাশা কী এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করে। এক সপ্তাহের সফরে প্রতিনিধিদল সবার সঙ্গে বৈঠক করে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে। এরপর ওই মাসে মূল তদন্ত দল কাজ শুরু করে। ওই মাসেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান শুরু করে। এর মধ্যে কাজের অগ্রগতি আনুষ্ঠানিকভাবে না জানালেও ঘটনার তথ্যগুলো সংগ্রহ করছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশ সফরে আসছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। তিন দিনের সফরে আজ মঙ্গলবার তার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা।
এদিকে ফলকার টুর্কের এ সফর নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে যে মানবাধিকার কার্যালয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, ফলকার টুর্কের এ সফরে সে বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে। এ ছাড়া জুলাই-আগস্টে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিও আলোচনায় আসবে। তবে গুরুত্ব পাবে মানবাধিকার কার্যালয় খোলার বিষয়টি। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সাইডলাইনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ফলকার টুর্কের যে বৈঠক হয়, সেখানেও কার্যালয় স্থাপনের বিষয়টি আলোচনা হয়েছিল।
অবশ্য সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মত হলো, মানবাধিকার কার্যালয় খোলার বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তা নয়। এর সঙ্গে দেশের ও সমাজের ভবিষ্যৎ কৌশলগত পন্থা নির্ধারণের বিষয় জড়িত। তাদের কেউ কেউ এ বিষয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংলাপের পক্ষে মত দেন।
সাবেক একজন কূটনীতিক বলেন, ‘এটি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একই সঙ্গে দেশের ও সমাজের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সিদ্ধান্ত।’ আরেকজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের অফিস খোলার বিষয়ে সমাজে বড় ধরনের সংলাপ হওয়া দরকার।’ একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘বড় ধরনের কোনো ঝামেলায় না পড়লে কোনো দেশই জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের অফিস খোলা অনুমতি দেয় না।’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এটা আসলে কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ এখানে কার্যালয় দিতে গেলে, সমাজে ব্যাপক একটি পরিবর্তন আনতে হবে। মানবাধিকার ইস্যুতে অনেক কিছুই যুক্ত হবে। ফলে দেশের জনগণ এটা চায় কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।’
কূটনীতিকদের ভাষ্য, আমরা হয়তো ধারণা করছি এখানে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের অফিস খুললে সব মানবাধিকার সমস্যার সমাধান হবে। ব্যাপারটা আসলে সেরকম নয়। তাদের মধ্যে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয়ের প্রসারের জন্য কাজ করে। বাংলাদেশে অফিস খোলা হলে এ বিষয়ে তাদের মতামত গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে।
তাদের মতে, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন কিছু বিষয়ের প্রসার চায়, যা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্য নয়। এর মধ্যে সমকামিতার বৈধতা বা সার্বজনীন শিক্ষা (যৌন শিক্ষাসহ) বা সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এসব বিষয় রয়েছে।
একজন সাবেক কূটনীতিক নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয় তুলে ধরে বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নারী ও পুরুষের মধ্যে উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের একটি নিয়ম আছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের ব্যবস্থা মেনে নিলে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমানভাগে সম্পত্তি বণ্টন করতে হবে। এরকম আরও অনেক বিষয় রয়েছে। ফলে এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত।
প্রতিটি দেশেরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের নজির রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে মানবাধিকার কার্যালয় স্থাপন করতে পারে না। কারণ এ ধরনের কার্যালয় স্থাপন করতে দিলে সে দেশে মানবাধিকার নিয়ে অনেক বেশি তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ পাবে। মূলত শক্তিশালী দেশগুলো মানবাধিকারকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ফলে বাংলাদেশ এখনো বিষয়টি বিবেচনার মধ্যে রেখেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ফলকার টুর্ক তার এ সফরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি অন্য উপদেষ্টা, সরকারি কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
ভলকার তুর্কের সফরের মধ্য দিয়ে এটি হবে দ্বিতীয় কোনো জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের বাংলাদেশ সফর। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে তৎকালীন হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট ঢাকা সফর করেছিলেন।
প্রসঙ্গত, ফলকার টুর্কের সেপ্টেম্বরে ঢাকা আসার কথা ছিল। কিন্তু সময় জটিলতার কারণে তা পিছিয়ে অক্টোবরে নির্ধারিত হয় সফর।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ফলকার টুর্কের ঢাকা সফর নিয়ে সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘের হাইকমিশনারের দপ্তর কাজ করছে। সে অনুযায়ী ২৯-৩১ অক্টোবর ঢাকা সফর করবেন তিনি।
যেভাবে কাজ করে মানবাধিকার কার্যালয় : বিশ্বে মাত্র ১৯টি দেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় রয়েছে। বাংলাদেশে কার্যালয় স্থাপন হলে তা হবে ২০তম। এ কার্যালয়গুলো থেকে প্রধানত মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ, সুরক্ষা, গবেষণা, সরকার, জাতীয় কর্তৃপক্ষ, নাগরিক সমাজ, ভুক্তভোগী ও অন্য প্রাসঙ্গিক সহযোগীদের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদান, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসাধারণের প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সহায়তার ব্যবস্থা করে থাকে। যেসব দেশে এ ধরনের কার্যালয় থাকে, সেখানে অবারিত প্রবেশাধিকার থাকে। ফলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কোনো সফর করতে হলে আলাদা করে সে দেশের সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয় না।
জাতিসংঘ যেভাবে তদন্তে যুক্ত হয় : গত জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি চলাকালেই জাতিসংঘ এ তদন্তের বিষয়ে কথা বলে। এরপর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে জাতিসংঘ নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানায়। সরকারের পক্ষ থেকেও তদন্ত কাজে সহযোগিতা করার কথা বলা হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক গত ১৬ আগস্ট এক বিবৃতিতে তদন্ত কাজের কথা জানান। সেই বিবৃতিতে বলা হয়, প্রথমে ২২ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহ জাতিসংঘের দলটির ঢাকা সফর করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারকে কোন কোন খাতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর সহযোগিতা করবে সেই খাতগুলো চিহ্নিত করা এ সফরের লক্ষ্য। এ ছাড়া বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের সহিংসতা ও অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্তের পদ্ধতি নিয়েও তারা আলোচনা করবে। বিবৃতি অনুযায়ী জাতিসংঘের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল সফর করে।
এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একটি অভিনন্দনপত্র লেখেন। চিঠিতে মহাসচিব বাংলাদেশে শান্তি ফেরানো এবং সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন। জাতিসংঘের প্রত্যাশা, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পন্থা গ্রহণ করবে, যার মধ্যে তরুণদের পাশাপাশি নারী, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বরও বিবেচনা করা হবে।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার ফলকার টুর্ককে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। এরপর জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে। ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে। বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের এই দলটি ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুষ্ঠু তদন্ত, কারণ নির্ণয় ও সুপারিশ প্রদান করবে।
