আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ

ছেলের চিকিৎসায় সুদে নেয়া ধারের টাকাও শেষ রিকশাচালক পিতার

  • গুলিতে আরমানের পেটের নাড়িভুঁড়ি-প্রস্রাবের রাস্তা ছিঁড়ে গেছে, আরও অস্ত্রোপচার প্রয়োজন
  • চড়া সুদে ৫০ হাজার টাকা ধার করে ছেলের চিকিৎসায় সেটাও শেষ রিকশাচালক পিতার
আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৪, ১১:২১ এএম

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বেডে মাসের পর মাস কাতরাচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ দিনমজুর কিশোর রমজান আলী আরমান। তার চিকিৎসায় চড়া সুদে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন রিকশাচালক পিতা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের পেছনেই সেই টাকাও শেষ।

১৮ জুলাই সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিল আরমান। ছররা গুলিতে তার নাড়িভুঁড়ি ছিড়ে গেছে। কোমরে ও উরুতেও গুলি লেগেছে তার। মলদ্বার বাইপাস করা হয়েছে। গুলিতে ইউরিনারি ব্লাডারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

দিনমজুর এই কিশোরের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা চিকদাইর নোয়াহাট এলাকায়। বাবার নাম মো. মনছুর। তিনি শহরে রিকশা চালান। তার বড়ভাই আরাফাত উল্লাহ (১৮) বাক প্রতিবন্ধী। তাদের মায়ের নাম হিরা আক্তার। গ্রামের বাড়ি রাউজান হলেও ১৯ বছর নগরের মুরাদপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকে তারা।

আরমান নগরের মির্জাপুর এলাকায় সিলভারে হাঁড়ি-পাতিল তৈরির একটি কারখানায় দৈনিক ১৩০ টাকা বেতনে কাজ করতো। ঘটনার দিন সে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে ঝালমুড়ি খেতে মায়ের কাছ থেকে ২০ টাকা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ছিলো।    

মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে চমেক হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ২৪ নম্বর শয্যাপাশে বসে আছেন মা হিরা আকতার। ব্যথার যন্ত্রণায় ছটফট উঠছে ছেলেটি। সুঠাম দেহের কিশোর আরমানের শরীরটা এখন যেন কঙ্কালসার। মুখে খেতে পারে না। হাতের শিরা দিয়ে চলছে খাবার স্যালাইন।

হিরা আক্তার জানান, নগরের মুরাদপুর এন মোহাম্মদ প্লাস্টিক শোরুমের পেছনে মোহাম্মদপুর এলাকায় মাসিক ৬ হাজার টাকার ভাড়া বাসায় দুই ছেলে এবং স্বামীকে নিয়ে বসবাস করতেন তারা। তার দুই পুত্র সন্তান। বড় ছেলে আরাফাত উল্লাহ (১৮) বাকপ্রতিবন্ধী। আরমান ছোট। সে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে। তবে অভাবের সংসারে পড়ালেখা বেশিদূর এগোয়নি।

হিরা আক্তার বলেন, গত ১৮ জুলাই বিকেল সাড়ে পাঁচটায় কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে আরমান। পরে ঝালমুড়ি খাবে বলে তার কাছ থেকে ২০ টাকা নিয়ে বের হয়। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায় আরমান আর ফিরে আসে না। সন্ধ্যার দিকে বাইরে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ হিরার কানে ভেসে আসছিলো। ছেলে আরমান ঘরে ফিরে না আসায় চিন্তা বাড়তে থাকে তার। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ছেলের খোঁজে বাসা থেকে বের হন হিরা। পাঁচলাইশ ও চান্দগাঁও থানায় গিয়ে ছেলের ছবি দেখায় দায়িত্বরত পুলিশদের। আরমানের কোনো হদিস পাচ্ছিলেন না হিরা। রাত ৮টার দিকে স্বামী-স্ত্রী দুজন যান চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু কেউ আরমানের খোঁজ দিতে পারছিলেন না। সন্তানের হদিস না পেয়ে হতাশ হয়ে বাসায় ফিরেন হিরা ও তার স্বামী মনছুর।

হিরা আরও জানান, তার বড়ছেলে আরাফাত উল্লাহ চান্দগাঁও থানাধীন বলিরহাট এলাকার একটি ফার্নিচারের দোকানে কাজ করে। ঘটনার দিন (১৮ জুলাই) সন্ধ্যার পর কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে বহদ্দারহাট মোড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের জ্বালিয়ে দেওয়া ট্রাফিক পুলিশ বক্স কৌতূহল বশত নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে আরাফাত। ১৯ জুলাই সকাল ৭টার দিকে ভিডিওটি খালাকে দেখায় আরাফাত উল্লাহ। ভিডিওটি ধারণ করার সময় আরাফাতকে উদ্দেশ্য করে “তোমার ভাইয়ের পেটে গুলি লেগেছে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে” বলে এক শিশুকে বলতে শোনা যায়। ওই শিশু আরমান ও আরাফাতকে চিনত বলে জানান হিরা আক্তার।

১৯ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বলির হাটে গিয়ে ওই শিশুর সন্ধান পান হিরা। আগের দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে বহদ্দারহাট এলাকায় আরমান কীভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল এবং কারা তার ছেলেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেছেন সে বিষয়ে হিরা আক্তারকে বর্ণনা দেয় শিশুটি। এরপর দুপুর ১২টার দিকে চমেক হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে গিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গুলিবিদ্ধ সন্তানের সন্ধান পান হিরা। কিন্তু সেদিন হাসপাতালের বেডে অচেতন অবস্থায় আরমানকে দেখে জ্ঞান হারান হিরা আক্তার। চিকিৎসকেরা সেদিনই হিরাকে জানান, তার ছেলে বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গুলিতে আরমানের পেটের নাড়িভুঁড়ি ও প্রস্রাবের রাস্তা ছিঁড়ে গেছে।

হিরা আক্তার জানান, সাতদিন পর ক্যাজুয়ালিটি বিভাগ থেকে ছেলের ছাড়পত্র পান তিনি। বাসায় ফিরে যাওয়ার পাঁচদিন পর আরমানের পা দুটি অবশ হয়ে যায়। এরপর চমেক হাসপাতালের ২৫ নং, ৭৯ নং এবং ২৭ নং ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলে আরমানের। গত ২২দিন ধরে সার্জারি ওয়ার্ডের ২৪ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন আরমান।

কীভাবে ছেলের চিকিৎসা খরচ মেটাচ্ছেন ? জানতে চাইলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হিরা আক্তার জানান, তিনিও বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য বেতনে চাকরি করতেন। ছেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাসপাতালে তাকে দেখাশোনার জন্য ওই চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। গত ১৯ বছর ধরে স্বামী এবং দুই সন্তান নিয়ে মুরাদপুরের মোহাম্মদপুর এলাকায় ছয় হাজার টাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলেন হিরা। কিন্তু ছেলের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সেই বাসাটিও চলতি মাসের শেষে ছেড়ে দিবেন। তার স্বামী পেশায় রিকশাচালক। কিন্তু তিনি নানা রোগশোকে আক্রান্ত। বড় ছেলে বাক প্রতিবন্ধী। ছোট ছেলে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে মাসের পর মাস। ‘ছেলের নানা পরীক্ষা, ওষুধ কেনার পেছনে ব্যয় হয়ে গেছে ৫০ হাজার টাকা। সংসারে তো অভাব। সুদি করে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছি এখন সেই টাকাও শেষ’ হতাশার সুরে বলেন হিরা আক্তার।

হিরা জানান, অভাবের সংসারে করুণ দৈনতায় কাটছে তাদের জীবন। তবে চমেক হাসপাতালে নিয়মিত এসে ভগ্নিপতি মামুন তার ছেলে আরমানের খোঁজ নেন। মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে সার্জারি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ২৪ নম্বর বেডে শুয়ে আছে কিশোর আরমান। হাতে ক্যানোলা লাগানো। যন্ত্রণায় ছটফট করছে সে। ক্যাথেটারে রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব।

সার্জারি ওয়ার্ডের এক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে জানান, গুলিতে আরমানের তলপেটে নাঁড়িভুঁড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রস্রাবের রাস্তাও ক্ষতি হয়েছে। তার মলদ্বার বাইপাস করা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে ফের অস্ত্রোপচার করে মলদ্বার ও প্রস্রাবের রাস্তা ঠিক করা হবে।’ আরমানের চিকিৎসা সেবায় সর্বোচ্চ নজরদারি আছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত