চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য নতুন কোনো খবর নয়। তবে সরকারি এই হাসপাতালের ৩৩ নম্বর প্রসূতি ওয়ার্ডে ‘দালালির’ ভিন্নতা রয়েছে। সেখানে বহিরাগতদের পাশাপাশি রমরমা কারবার চলে ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ দালালদেরও, যাদের বেশিরভাগই হাসপাতালটির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। অফিস সহায়ক বেলাল ও সাত্তারের নেতৃত্বে এই ওয়ার্ডে সক্রিয় ১৫-১৬ জনের একটি দালাল চক্র। যারা টাকার বিনিময়ে ‘সেবা’ দেন রোগীদের।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা ও রক্ত জোগাড় করাসহ বিভিন্ন অজুহাতে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন দালাল চক্রের সদস্যরা। বেলাল-সাত্তার দালাল চক্রের পক্ষে ফাতেমা নামের এক আয়া ‘সেবার’ নামে প্রতি রোগী কিংবা তার স্বজনের কাছ থেকে আদায় করেন ৬০০-৭০০ করে টাকা। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ নম্বর প্রসূতি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ভর্তি থাকে ১৫০ থেকে ২০০ রোগী। সে হিসেবে দৈনিক ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে দালাল চক্র।
বেলাল ও সাত্তারের নেতৃত্বে চাঁদাবাজির তথ্য পেয়েছে খোদ হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষও। তাদের চাঁদাবাজির তথ্য উঠে এসেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও। অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গেলে গত ৩০ অক্টোবর সকাল ৯টার দিকে কামরুজ্জামান নামের এক ওয়ার্ড মাস্টারকে শারীরিকভাবে নাজেহাল করেন বেলাল। সেদিনের ঘটনার যাতে কোনো ভিডিও ফুটেজ না থাকে সেজন্য ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিসিটিভি ক্যামেরা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন বেলাল।
জানা গেছে, গাইনি ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি থেকে শুরু করে দ্রুত শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার তারিখ পাইয়ে দেওয়া, অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা, আইসিইউতে স্থানান্তর, রক্ত জোগাড় এবং চিকিৎসকের সঙ্গে ‘পেশেন্ট পার্টি’র দেখা করিয়ে দেওয়াসহ সংশ্লিষ্ট সবকিছুই করছেন দালাল বেশে সরকারি কর্মচারীরা।
হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ এই ওয়ার্ডে ‘দালাল রাজত্বে’র কথা স্বীকারও করেছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অচিকিৎসক কর্মীদের একাংশ বহিরাগত দালালদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন বলে অনেক ক্ষেত্রে হাতেনাতে ধরা মুশকিল। এই ওয়ার্ড থেকে প্রায় প্রতিদিন দালাল ধরছি। যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রসূতি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীদের কাছ থেকে সেবার নামে হয়রানি বা টাকা আদায়ের অভিযোগ পাচ্ছি, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মকর্তারা জানান, আউটডোরের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে কোনো রোগী জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি হলে তার স্বজনকে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কিছু পরীক্ষা করিয়ে আনতে বলা হয়। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ নতুন জায়গায় এসে কিছু বুঝতে না পেরে বিভ্রান্ত হয়ে যান। কোথায় যাবেন, কী করবেন, বুঝে উঠতে পারেন না। এই মানুষদেরই পাকড়াও করে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের একাংশ।
ওষুধ কিনে দেওয়া ছাড়াও বাইরে ল্যাবে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নবজাতকের কানে আজান দেওয়া, রোগীর স্বজনদের ওয়ার্ডের ভেতর যেতে দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজে বহিরাগত দালালের পাশাপাশি বেশি তৎপর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সরকারি কর্মচারীরা। এমনকি নার্স ও আয়ারাও। জানা গেছে, এই ওয়ার্ডে ‘রোগী ভর্তি ফরম ও রোগী বৃত্তান্ত’ লেখার নির্দিষ্ট একটি কাগজ থাকে। সেখানে দায়িত্বপালন করেন একজন ওয়ার্ডবয়। তিনি রোগীর নাম-ঠিকানা লেখেন। পরে কৌশলে ওই রোগীর তথ্য ওয়ার্ডের অন্য কর্মচারীকে দিয়ে দেন। এরপর রোগীর স্বজনকে নানা কায়দায় ‘জিম্মি’ করে ফেলেন দালালরা।
দালালরা গাইনি ওয়ার্ড কিংবা অন্যান্য ওয়ার্ডে সরকারি কর্মী সেজে রোগীদের কাছ থেকে ওষুধের সিøপ নিয়ে যান। তারা দুই হাজার টাকার ওষুধের দাম পাঁচ-ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে নেন। এসব তথ্য জানতে পারার কথা গতকাল শনিবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের অন্যতম এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল বিকেলে দালাল চক্রের নেতৃত্বে থাকা বেলাল ও সাত্তারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া মেলেনি।