শিশু অন্ধত্বের অন্যতম কারণ চোখের রেটিনাজিনত ‘রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটি’ (আরওপি) রোগের চিকিৎসার কার্যকর ব্যবস্থাপনা না হলে দেশে দৃষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করছে ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের (আইএপিবি) বাংলাদেশ চ্যাপ্টার।
চ্যাপ্টারের চেয়ার ও অপথালমোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আরওপিজনিত দৃষ্টিহীনতা রোধ করতে ব্যর্থ হলে দেশে প্রতিবছর ৪০০ শিশু অন্ধ মানুষের সঙ্গে যুক্ত হবে।
আজ রবিবার রাজধানীতে অরবিস ইন্টারন্যাশনাল আয়োজিত ‘ন্যাশনাল আরওপি প্রোগ্রাম: অপশন অ্যান্ড অপারচুনিটিজ’ শীর্ষক এক পরামর্শ সভায় এমন সতর্কতা উচ্চারণ করেন এই চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ।
পরামর্শ সভায় বলা হয়, আরওপি এমন একটি চক্ষুরোগ যাতে অকালে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ যেসব শিশু মাতৃগর্ভে ৩৫ সপ্তাহ পূরণের আগেই জন্ম নেয় কিংবা জন্মকালে যাদের ওজন ২ কিলোগ্রামের কম থাকে- এমন শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ লাখের বেশি শিশু জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বা প্রায় ৪ লাখ শিশু অকালে জন্মগ্রহণ করে।
আরওপি থেকে রক্ষায় রোগটি প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডা. এনায়েত হোসেন। তিনি বলেন, দেশের কয়েকটি হাসপাতালে আরওপি পরীক্ষার যে আটটি রেটক্যাম্প অর্থাৎ আধুনিক ডিজিটাল ইমেজিং যন্ত্র রয়েছে, সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হবে।
সভায় বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসের (বিসিপিএস) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, দেশে প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের অভাবে আরওপি পরীক্ষার হার এখনও কম।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, চোখের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি হলে আরওপি সেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা যেত।
সভায় বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও সচেতনতা ও সঠিক রেফারেলের অভাবে বাংলাদেশ কার্যকরভাবে আরওপি ব্যবস্থাপনা করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে এই রোগের ব্যবস্থাপনায় সফলতা আসবে না বলে সতর্ক করেন তারা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিট্রিও রেটিনা বিভাগের অধ্যাপক ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, অকালে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের সময়মতো টারশিয়ারি বা সর্বোচ্চ স্তরের চক্ষু হাসপাতালে রেফার করতে হবে। যেখানে নিকু (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট) এবং স্ক্যানু (বিশেষ যত্ন নবজাতক ইউনিট) আছে সেখানে আরওপি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নাজমুন নাহার বলেন, শুধু প্রেসক্রিপশনে লিখলেই হবে না। জন্ম নেওয়া নবজাতকের আরওপি ঝুঁকি সম্পর্কে তার বাবা-মাকে বোঝাতে হবে ও শিশুটিকে পরীক্ষা ও রেফারেল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে।
অরবিস ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. মুনির আহমেদ বলেন, সময়মতো শনাক্ত এবং চিকিৎসা না হলে আরওপি দ্রুত অন্ধত্ব পর্যায়ে যেতে পারে। জন্মের ২০-৩০ দিনের মধ্যে পরীক্ষা এবং আরওপির প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগের কারণে অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা যায়।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশনের (সিএমই) পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দা শাহিনা সুবহান, শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. মনির হোসেন ও অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নান, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লায়লা আরজুমান্দ বানু, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিভাগের সাবেক পরিচালক ডা. খালেদা ইসলাম, নবজাতক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে, শিশু চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. কাজী শাব্বির আনোয়ার, আইআরডি গ্লোবালের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. তাপস রায়, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. তারিক রেজা আলী এবং ডা. মাহজাবীন চৌধুরী, অরবিসের সহযোগী পরিচালক ডা. লুৎফুল হোসেন, ইউনিসেফের পরামর্শক ডা. জাহিদ হাসান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মো. জহুরুল ইসলাম আলোচনায় অংশ নেন।
