যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট কে হবেন তা জানতে দেশটির নাগরিকরা যেমন অপেক্ষায় আছেন, তেমনি কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে বিশ্ব সম্প্রদায়ও। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন বহির্বিশ্বেও ব্যাপক প্রভাব রাখে। বিশ্ব জুড়ে বাণিজ্যসহ নানা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কেমন হবে, সেটির অনেকটাই নির্ভর করে দেশটির শাসন ক্ষমতায় থাকছে কোন দল তার ওপর। ফলে বরাবরের মতো এবারও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলের অপেক্ষায় আছে চীন, রাশিয়া, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশ।
কী ভাবছে চীনের জনগণ : চীনের সাধারণ জনগণ অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে নজর রাখছেন। অবশ্য তাদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগও কাজ করছে। নির্বাচনে জিতে যে-ই হোয়াইট হাউজে যান না কেন, তাতে চীন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কতটা পরিবর্তন হবে সে বিষয়ে কিছুটা শঙ্কায় ভুগছেন তারা। এ বছর এমন এক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন তাইওয়ান, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আন্তর্জাতিক নানান বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেশ উত্তেজনা বিরাজ করছে। জিয়াঙ নামের ষাটোর্ধ্ব এক চীনা নাগরিক বলেন, আমরা কেউই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ দেখতে চাই না। আমরা শান্তি চাই। চীনা নাগরিকরা শুধু ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ঘিরেই উদ্বিগ্ন নন, বরং বিশ্ব জুড়ে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে, তা নিয়েও বেশ চিন্তিত। যুক্তরাষ্ট্রের এ নির্বাচনে কমলার থেকে ট্রাম্পের জয় দেখতে চান বেশিরভাগ চীনা নাগরিক। আর এর পেছনে ডেমোক্র্যাটদের সময়ে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের দামামা বৃদ্ধির কথা বলেছেন চীনের সাধারণ মানুষ।
আর সে কারণেই অনেকগুলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ট্রাম্পের পক্ষেই কথা বলেছেন চীনারা। কমলা জিতলে তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেনের দেখানো পথেই হাঁটবেন বলে মনে করছে দেশটির সাধারণ মানুষ। যদিও বিশ্লেষকদের বেশিরভাগই মনে করেন যে, কে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন সে বিষয়ে বেইজিংয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট পছন্দ-অপছন্দ নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তাইওয়ানের মতো বড় ইস্যুর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের চেয়ে হ্যারিসের অবস্থান বেশি স্থিতিশীল হবে বলে মনে করেন কেউ কেউ। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ শেষ পর্যন্ত সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তবে চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি দেশটি এক চীন নীতিরও বিরোধিতা করেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রই তাইওয়ানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক।
তাইওয়ান বিষয়ে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো মন্তব্য করেননি কমলা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাইওয়ান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সব জাতির নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রতি অঙ্গীকারের কথা বলেছেন। অন্যদিকে, তাইওয়ান প্রশ্নে কূটনীতির চেয়ে একটি বিশেষ চুক্তির প্রতিই বেশি জোর দিয়েছেন ট্রাম্প। যেটির আওতায় সুরক্ষা পেতে হলে তাইপেকে অর্থ ব্যয় করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তবে রিপাবলিকান পার্টির এ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে নিয়ে চীনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, তিনি এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে চীনা পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছেন। চীনের ব্যবসায়ীরা মোটেও সেটি ভালোভাবে নিচ্ছেন না। বেইজিং বিশ^াস করে যে, বিশে^ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই তাদের পণ্যের ওপর শুল্কারোপ করা হচ্ছে।
রুশদের ভাবনা : ২০১৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ায় রাশিয়ার উগ্র-জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ ভøাদিমির ঝিরিনোভস্কি এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন যে, রুশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘দুমা’ ও দলীয় কার্যালয়ে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনেই ১৩২টি শ্যাম্পেইনের বোতল খুলে উদযাপন করেছিলেন। কারণ মি. ঝিরিনোভস্কি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন, মি. ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় রুশ-মার্কিন সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। নির্বাচনের ফল ঘোষণা করার পরদিন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরটির প্রধান সম্পাদক মার্গারিটা সিমোনিয়ান এক এক্স বার্তায় অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন যে, মার্কিন পতাকা উড়িয়ে তিনি মস্কোর রাস্তায় গাড়ি চালাতে চান।
মস্কোর আশা ছিল, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর রাশিয়ার ওপর থেকে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবেন। যদিও বাস্তবে সেসবের কিছুই ঘটতে দেখা যায়নি। ফলে তখন রুশ নাগরিকদের মধ্যে যারা একটু বেশিই আশা করে ফেলেছিলেন, তাদের সেই মোহ কাটতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে রুশ নাগরিকদের মধ্যে।
ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে ট্রাম্প বাইডেন প্রশাসনের কড়া সমালোচনা করেছেন। এ যুদ্ধ শুরুর জন্য সরাসরি ইউক্রেনকে দায়ী করেছেন তিনি। কিন্তু ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে এর ঠিক বিপরীত অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। তিনি ইউক্রেনের পক্ষে কথা বলছেন এবং নানান যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেছেন, নিজেদের কৌশলগত স্বার্থেই কিয়েভকে সমর্থন করা প্রয়োজন। এসব বক্তব্য প্রদানের সময় তিনি রুশ প্রেসিডেন্টকে খুনি স্বৈরশাসক বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে এসব আলোচনার বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন রাশিয়ার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প ও হ্যারিসের মধ্যে কেউ একজন যদি সামান্য ব্যবধানে হেরে যান, সে ক্ষেত্রে দুপক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এতে সারা দেশে নির্বাচন-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি এবং সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়বে। ফলে সেগুলো ঠেকাতেই সরকার ব্যস্ত হয়ে পড়বে। এতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈদেশিক নীতির বিষয়ে তাদের মনোযোগ কম থাকবে বলে মনে করেন অনেকে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষমতা নেওয়ার পর রুশ-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সেটির আরও অবনতি হয়। আর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে পৌঁছায়। রাশিয়ার ওপর রীতিমতো নিষেধাজ্ঞার সুনামি বইয়েছে বাইডেন প্রশাসন। সেই সঙ্গে, গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধে টিকে থাকতে কিয়েভকে সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যা দুই দেশের তিক্ততা চরমে পৌঁছে দিয়েছে।
তবে ভিন্নমতও রয়েছে রুশ নাগরিকদের মধ্যে। অনেক রুশ নাগরিকই মনে করেন, বৈরিতা ছেড়ে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। তাতে বিশ^ জুড়ে যুদ্ধবিগ্রহ কমতে সহায়ক হবে। আবার অনেকেই নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। নিকিতা নামের আরেক রুশ নাগরিক বলেন, আমাদের দুই দেশ এবং সেখানকার জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হওয়া উচিত। রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে নানান পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশ দুটির মধ্যে একটি বিষয়ে বেশ মিল রয়েছে। সেটি হলো, দুই দেশেই কখনো কোনো নারী প্রেসিডেন্ট হতে দেখা যায়নি। ফলে আসন্ন নির্বাচনে অনেকেই কমলা হ্যারিসের জয় দেখতে চান।
ইউক্রেন ও ইউরোপের ভাবনা : যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ইউরোপ ও পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীর ভাবনা মহাদেশীয় নিরাপত্তা ও ইউক্রেন যুদ্ধে তার কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপের একাধিক দেশ। এ নির্বাচনের ফলের ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে। এ যুদ্ধের জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দায়ী করেছেন ট্রাম্প। আসন্ন নির্বাচনে জিতলে একদিনেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো ধরনের অবসান হলে সেটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের জয় হিসেবেই পরিগণিত হবে। আবার পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর তীব্র সমালোচক ট্রাম্প। অন্যদিকে বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস নির্বাচনে জয়ী হলে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার নীতি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। সম্প্রতি রাশিয়ার হয়ে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা পাঠানোর বিষয়ে কোনো সীমা রাখা হবে না বলে জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য : ট্রাম্প-কমলা দুজনের মধ্যেই যে জিতুক না কেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতির খুব একটা পরিবর্তন হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। গাজা ও লেবাননে আগ্রাসন বন্ধে ইসরায়েলকে তেমন কোনো হুঁশিয়ারি দেয়নি বাইডেন প্রশাসন। উপরন্তু মিত্র দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথা বলে তাদের সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন। আবার অন্যদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাও করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে তাদের এ দ্বৈত নীতির কারণে এবারের নির্বাচনে আরব আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন কমেছে। আবার ইসরায়েলের কড়া সমর্থক হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প। তার সময়েই জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থাপন করা হয়। ফলে রিপাবলিকানদের জয় হলে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে আমূল পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনাই নেই।
