রাজনীতির চূড়া দখলে আইনজীবী-ব্যবসায়ী

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৪, ০১:৫৬ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট গ্রহণ চলছে। এবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে যাওয়ার এই লড়াইয়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের আভাস দিয়েছে ভোটপূর্ব জনমত জরিপগুলো। এমনকি আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণের আগেই এবার যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ডসংখ্যক আগাম ভোট পড়েছে। তাই সাম্প্রতিককালে এই নির্বাচনকে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর দেশটির রাজনীতির শীর্ষ মঞ্চে উঠে আসার গল্প বেশ চমকপ্রদ। দেখে নেওয়া যাক, দুই প্রার্থীর শৈশব থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার যাত্রা কেমন ছিল।

১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ওকল্যান্ডে জন্ম এবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলার। তার শৈশব কেটেছে সেখানেই। মা শ্যামলা গোপালান হ্যারিসের কাছে বেড়ে ওঠেন তিনি। তার মা ছিলেন একজন ক্যানসার গবেষক ও সমাজকর্মী। ভারত থেকে উচ্চশিক্ষার কারণে ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন তিনি। কমলার বাবা ডোনাল্ড জ্যাসপার হ্যারিস ছিলেন আফ্রো জ্যামাইকান অর্থনীতিবিদ। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে মায়ের শিক্ষকতার কারণে পরে কানাডার মন্ট্রিলে পাড়ি জমায় কমলার পরিবার। সেখানকার একটি হাইস্কুলে পাঁচ বছর পড়াশোনা করেন তিনি। পরে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে ওয়াশিংটন ডিসিতে কৃষ্ণাঙ্গদের ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পড়াশোনা করেন আইনশাস্ত্রে।

প্রাথমিক জীবনে মায়ের কাছ থেকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের গুরুত্ব বুঝতে শেখেন কমলা। ২০০৪ সালে ওয়াশিংটনে বার্ষিক মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ফ্রিডম মার্চে অংশ নিয়েছিলেন কমলা। পরে ওয়াশিংটন থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে আসেন তিনি। সেখানে খুব দ্রুত অঙ্গরাজ্যটির ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসেন কমলা। এক সময় দায়িত্ব পান রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের। এই দায়িত্ব পালনের সময়ই শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিতে নাম লেখানোর অনুপ্রেরণা পান কমলা। ২০১৬ সালে সেখানকার সিনেটর নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৪ সালে ডুগ এমহফকে বিয়ে করেন কমলা। তিনি নিয়মিত কমলার পক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। এমহফের প্রথম ঘরের ছেলে কোল ও মেয়ে এলাকে নিয়ে তাদের সংসার।

চার বছর পর প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রচার চালান কমলা। কিন্তু সে সময় তার প্রচার খুব একটা আলোচনায় আসেনি। ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন পান বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আর তার ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন কমলা। সে নির্বাচনে ট্রাম্প ও তার রানিংমেট মাইক পেন্সকে হারিয়ে সরকার গঠন করেন বাইডেন-কমলা।

আর রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড জে ট্রাম্পের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের কুইন্সে। ট্রাম্পের বাবা ফ্রেড ট্রাম্প ছিলেন একজন জার্মান অভিবাসীর সন্তান। মা মেরি অ্যান ম্যাকলয়েড ট্রাম্প জন্মগ্রহণ করেন স্কটল্যান্ডে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ট্রাম্প চতুর্থ। ছোটবেলা থেকে ট্রাম্প ছিলেন দুরন্ত। স্বভাবে চঞ্চল থাকায় মাত্র ১৩ বছর বয়সেই নিউ ইয়র্কে সামরিক একাডেমিতে ভর্তি করা হয়। ১৯৬৮ সালে ট্রাম্প পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ারটন স্কুল থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক করেন। পরে বাবার ব্যবসায় যোগ দেন। সেটি সম্প্রসারণ করে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন হোটেল, বহুতল ভবন, গলফ কোর্স, ক্যাসিনো প্রভৃতি ব্যবসা। রাজনীতিতে নাম লেখানোর আগে ট্রাম্প ছিলেন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। ২০১৫ সালের ১৫ জুন কোটিপতি ব্যবসায়ী ট্রাম্প আচমকা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। তার সেই ঘোষণাকে খুব কম লোকই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। এ নিয়ে হাসিঠাট্টাও কম হয়নি। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তৎকালীন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বিশ্বকে চমকে দেন ট্রাম্প। ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি শপথ নেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বিয়ে করেছেন তিনবার। তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। তার প্রথম স্ত্রী চেক মডেল ইভানা। ১৯৯২ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। দ্বিতীয় স্ত্রী মার্লা ম্যাপলস। ১৯৯৩ সালে তাদের বিয়ের পর বিচ্ছেদ ১৯৯৯ সালে। ২০০৫ সালে মডেল মেলানিয়াকে বিয়ে করেন ট্রাম্প।

ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমলা প্রথম বিদেশ সফর করেন ২০২১ সালে। সে বছর তিনি গুয়াতেমালায় যান। এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে লাতিন আমেরিকার অধিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীর সংখ্যা কমিয়ে আনা। কমলার সময়ে বৈদেশিক নীতিসংক্রান্ত বিষয়গুলোও বেশ আলোচনায় ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, গাজাযুদ্ধ ও আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার। ক্ষমতা গ্রহণ করেই কভিড-১৯ মহামারির লকডাউন, মাস্ক ব্যবহারের অনুমোদন ও সামাজিক অস্থিরতার মুখে পড়ে জো বাইডেন ও কমলার সরকার। সে সময় মিনিয়াপলিসে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ক্ষমতায় বসার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে কমলা হ্যারিসকে। তবে ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে দেশ জুড়ে নারীদের গর্ভপাতের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে তিনি আবার সরব হয়ে ওঠেন। ট্রাম্পই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টকে বেশি রক্ষণশীল করে তুলেছিলেন। গর্ভপাতের অধিকার কেড়ে নেওয়ার যে রায়, সেটির পথ প্রশস্ত করেছিলেন।

ওভাল অফিসে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বের করে আনেন এবং অভিবাসন কমানোর উদ্যোগ নেন।

এবারের নির্বাচনী দৌড়ে একটু দেরিতেই এসেছেন কমলা। জো বাইডেন প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে কমলাকে সমর্থন দেন। এর মধ্য দিয়ে প্রথম কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ও এশিয়ান-আমেরিকান হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের টিকিট পেয়ে কমলা ইতিহাস গড়েছেন এবং ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগোতে ডেমোক্রেটিক দলের জাতীয় সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছেন। অন্যদিকে, এ নির্বাচনে নিজ দলের পক্ষ থেকে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মনোনয়ন পেয়ে বিরল গৌরব অর্জন করেছেন ট্রাম্প। বন্দুক হামলায় আহত হয়ে কানে ব্যান্ডেজ নিয়েই তিনি উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের মিলওয়াকিতে রিপাবলিকান দলের জাতীয় সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত