আধুনিক ইতিহাসের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বকেও প্রভাবিত করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন তাই বরাবরই পুরো বিশে^র নজর কেড়ে নেয়। ক্ষমতাধর এ দেশটিতে সম্প্রতি হয়ে গেল ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দেশটিতে আজ ৪৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হচ্ছে। নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে দেখে নেওয়া যাক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০ প্রেসিডেন্ট কারা ছিলেন।
আব্রাহাম লিংকন : ১৮৬১ সালে আব্রাহাম লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৮৬৫ সালের এপ্রিল মাসে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন তিনি। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি তার দেশের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, তিনি পুরো বিশ্বের একজন প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিবেচিত হন। তার হাত ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে দাস প্রথার অবসান ঘটে। দাস প্রথাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় তার অসাধারণ নেতৃত্ব গুণ, বাগ্মিতা, দূরদর্শিতার বলে তিনি আমেরিকান গৃহযুদ্ধকালে সফলভাবে সব প্রতিবন্ধকতা জয় করতে সক্ষম হন। গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের অংশগ্রহণ, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য এ অমোঘ বাণীর জন্য তিনি আজও অমর হয়ে আছেন।
জন এফ কেনেডি
জন এফ কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট। তিনি আমেরিকার দ্বিতীয় কমবয়সী প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রেসিডেন্ট তিনি, যে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সে বছর নভেম্বরে আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান কেনেডি। জন এফ কেনেডির উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে কিউবার মিসাইল সংকট, আফ্রিকান-আমেরিকান সিভিল রাইটস মুভমেন্ট এবং বে অব পিগস আক্রমণ। এ ছাড়া তিনি চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রথম উদ্যোগ অ্যাপোলো প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন।
জর্জ ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বপ্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন। তিনি আমেরিকার বৈপ্লবিক যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর চিফ কমান্ডার ছিলেন। তিনি খসড়া সংবিধান প্রতিস্থাপন করেন। তিনি ১৭৬৫ সালের স্ট্যাম্প আইনের বিরোধিতা করেন। তার লক্ষ্য ছিল এমন একটি জাতি গঠনের, যা আর্থিকভাবে সচ্ছল হবে। ১৭৮৮ সালে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হন।
ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট
ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি চারবার নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগপর্যন্ত দেশের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বিশ্বের একজন মূল রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হন যখন পুরো বিশে^ অর্থসংকট চলছিল। ১৯৩২ সালে তিনি হার্ভার্ট হভারকে পরাজিত করেন। তিনি ১৯৩৩ সালে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য ফেডারেল আমানত বীমা করপোরেশন নির্মাণ করেন। জাতিসংঘের প্রস্তাবক ছিলেন তিনিই। ১৯৪৫ সালে জীবনাবসান হয় তার।
রোনাল্ড রিগ্যান
যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন রোনাল্ড রিগ্যান। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি তার অভিনয় প্রতিভার দরুন সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। তার সময়কালে অর্থনীতিতে সচ্ছলতা লাভ করে যুক্তরাষ্ট্র।
থিওডোর রুজভেল্ট
যুক্তরাষ্ট্রের ২৬তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন থিওডোর রুজভেল্ট। মাত্র ৪২ বছর বয়সে দেশটির প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন তিনি। ১৯০১ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। রুশ-জাপান যুদ্ধাবসানে ভূমিকা রাখার জন্য ১৯০৬ সালে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।
টমাস জেফারসন
টমাস জেফারসন ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা তিনি। দেশটির তৃতীয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেফারসন। তিনিই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রথম কথা বলেন। ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা লাভের পর দেশটির ১৩টি অঙ্গরাজ্যের সীমানাও নির্ধারণ করেন জেফারসন। এর আগে ভার্জিনিয়া শহরের গভর্নর হিসেবে এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
হ্যারি এস ট্রুম্যান
হ্যারি এস ট্রুম্যান ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করে। এর প্রভাব হিসেবে আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কে ফাটল ধরে, যা স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা ছিল। ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নাৎসি জার্মানি আত্মসমর্পণ করে। জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে তিনি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের অনুমতি দেন। তিনি ১৩ বিলিয়ন ডলারের মার্শাল পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন।
উড্রো উইলসন
উড্রো উইলসন যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এবং একই সঙ্গে তিনি নিউ জার্সির গভর্নর পদেও নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯১২ সালে কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউজের নিয়ন্ত্রণ হাতে পান। তিনি কিছু প্রগতিশীল আইন প্রণয়ন করেন, যা ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত চলে।
গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড
গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের ২২তম ও ২৪তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি বোরবন ডেমোক্র্যাটের প্রধান নেতা ছিলেন এবং উচ্চ শুল্ক ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি ব্যবসায়ী ও কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যার ফলে তিনি আমেরিকান আইকনে পরিণত হয়েছিলেন।
