শীত মৌসুমের শুরুতেই সিরাজগঞ্জের চলনবিলের নদী, খাল, জলাশয় ও পুকুরে ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে শুরু করেছে পরিযায়ী অতিথি পাখি। ফলে এসব জলাশয় এখন অতিথি পাখির কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে। সাইবেরিয়ার প্রচ- শীতের তীব্রতা থেকে জীবন বাঁচাতে এই পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে চলনবিলে। এ সুযোগে অর্থলোভী অসাধু শিকারিরা এসব অতিথি পাখি শিকারে মেতে উঠেছে। তারা বিভিন্ন ধরনের কারেন্ট জাল ও ফাঁদ পেতে এসব পরিযায়ী পাখি নিধনে মেতে উঠেছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় চলনবিলে প্রতিদিন ঝাঁকে ঝাঁকে এসব পরিযায়ী পাখি শিকার করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
এলাকাবাসী জানায়, উত্তরাঞ্চলের মৎস্য ভা-র খ্যাত চলনবিলের তাড়াশ উপজেলার দিঘীসগুনা গ্রামের দিঘীবাজার ও সগুনা ইউনিয়নের কুন্দইল গ্রামের বাজারে রীতিমতো এসব পরিযায়ী পাখি বিক্রির বাজার বসে। পাখি শিকারীরা সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাখি শিকার করে। এরপর ভোরে পাখিগুলো বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। একইসঙ্গে বারুহাস ইউনিয়নের বস্তুল বাজার ও পঁওতা বাজারে অতিথি পাখিসহ বিভিন্ন ধরনের শত শত বক শিকার করে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পাখি শিকারি বলেন, পাখি শিকারে যে বিধিনিষেধ আছে তা জানা নেই। বাজারে অতিথি পাখির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অন্য কাজের পাশাপাশি অল্প শ্রমে পাখি শিকার করে অধিক টাকা উপার্জন করা যায়। শিকার করা পাখি কিনতে অনেকেই বাড়িতে আসে।
তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের (প্রভাষক) মর্জিনা ইসলাম বলেন, বর্তমানে চলনবিলাঞ্চলের নদী, খাল-বিল ও পুকুরের পানি কমতে শুরু করেছে। এ সময় পুঁটি, খলসেসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট মাছ ও পোকা-মাকড় পাওয়া যায়। অতিথি পাখিরা খাবারের সন্ধানে ও অপেক্ষাকৃত শীত থেকে বাঁচতে শামুকখোল, বালিহাঁস, হরিয়াল, বুনো হাঁস, ছোট সারস পাখি, বড় সারস পাখি, নিশাচর, পানকৌড়ি, কাদাখোঁচা, রাজসরালি, পাতিকুট, রামঘুঘুসহ নানা প্রজাতির অতিথি পাখি আশ্রয় নেয় এ চলনবিলে। এই পাখিগুলো অসাধু শিকারিরা ফাঁদ পেতে অবাধে পাখি শিকার করে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছেন।
চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির তাড়াশ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, শিকারিদের কাছে থেকে পাখি কিনে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেয় অন্যদের দেখানোর জন্য। এতে বোঝা যায় পাখি শিকার করা যে দ-নীয় অপরাধ, তা নিয়ে শিকারি বা ক্রেতাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র ভীতি নেই। চলনবিলের পাখি বাঁচাতে আইন প্রয়োগের পাশাপশি লোকজনের মধ্যে ব্যাপকহারে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। তাহলে এই অঞ্চল থেকে পাখি শিকার বন্ধ হবে ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।
তাড়াশ উপজেলা বন কর্মকর্তা কামরুজ্জামান বলেন, শীতের আমেজ শুরু হওয়ায় বিভিন্ন জাতের পাখি আসছে। এই পাখিগুলোকে রাতের আঁধারে অসাধু কিছু শিকারিরা শিকার করছে। এই বিশাল চলনবিলের মধ্যে তাদের খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে অসাধু পাখি শিকারিদের খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুইচিং মং মারমা বলেন, ‘পাখি শিকারিদের অবস্থান জানা গেলে অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজনে যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে পাখি শিকারিদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
