বাদী ও বিএনপি নেতাদের ম্যানেজ করে মামলা থেকে অব্যাহতি!

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৪, ০৬:৪১ এএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জের সাতটি থানায় করা অন্তত ৮০টি মামলায় আসামি হয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কয়েক হাজার নেতাকর্মী। এসব মামলা নিয়ে মোটা অঙ্কের বাণিজ্য চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বাদী ও কিছু বিএনপি নেতাকে ম্যানেজের মাধ্যমে ওইসব মামলা থেকে হলফনামার মাধ্যমে অব্যাহতি নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতারা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন আসামির পক্ষে আদালতে জামিন শুনানিতে উপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে বিএনপির পদধারী কয়েকজন আইনজীবীর।

জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে গত তিন মাসে সাতটি থানায় অন্তত ৮০টি মামলা করা হয়েছে। মামলায় বেশিরভাগ আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের। এর মধ্যে বেশ কিছু মামলায় অর্ধডজনের বেশি সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষজনও রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মামলাগুলোর এজাহার তৈরির বিষয়ে কাজ করেছেন বিএনপির পদধারী কয়েকজন আইনজীবী। তাদের মূল লক্ষ্য হলো মোটা অঙ্কের টাকায় আসামিদের জামিন ব্যবস্থা করা কিংবা মামলা থেকে অব্যাহতির অজুহাতে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। ইতিমধ্যে মামলাগুলো নিয়ে বাদীর হলফনামা বাণিজ্য শুরু হয়েছে। বাদী-আসামিদের পক্ষে আদালতে হলফনামা দাখিল করে দাবি করছেন ভুলবশত আসামিদের মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাদের যেন গ্রেপ্তার কিংবা হয়রানি না করে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সেজন্য বাদীর হলফনামা নথিভুক্ত করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অবহিত করার আদেশ নেওয়া হচ্ছে। এর বিনিময়ে মামলার বাদী ও বিএনপিপন্থি আইনজীবী নেতারা আসামিদের কাছ থেকে পাচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা।

গত ২৭ অক্টোবর গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে অপহরণ ও চাঁদাবাজি মামলায় ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের ক্যাশিয়ারখ্যাত কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোকাররম সর্দারকে গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ পরদিন ২৮ অক্টোবর দুপুরে মোকাররম সর্দারকে আদালত জামিন দেয়। আদালতে ওঠানোর আগেই বাদীপক্ষ আদালতে এসে আপসনামা কোর্টে দাখিল করায় জামিন হয়ে যায় মোকাররম সর্দারের।

আদালত সূত্র বলছে, রূপগঞ্জ থানার মামলায় জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ও কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের পক্ষে ওকালতনামা গ্রহণ করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবী সিদ্দিকুর রহমান। ওই মামলায় বিএনপির আরও বেশ কজন সিনিয়র আইনজীবী বেনামে আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছেন। এ ছাড়া ফতুল্লা থানা যুবলীগ নেতা আজমতউল্লাহর পক্ষেও বেনামে বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরা আইনি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম ইকবাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাবেদ রায়হান জয়, সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুমের পক্ষেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বাদী আদালতে হলফনামা দাখিল করেছেন সোনারগাঁ থানার আলাদা দুটি হত্যা মামলায়। অথচ তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। বাদীর সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবীও রয়েছেন এই আপসনামা সমঝোতার নেপথ্যে।

মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউছার আশা বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ কোর্টে এখন কিন্তু আওয়ামী লীগের আইনজীবী নেই। তাহলে আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন কারা করাচ্ছেন? আপনারাই মামলা দেবেন আবার আপনারাই জামিন করাবেন, ভালোভাবেই বাণিজ্য করে যাচ্ছেন।’ নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল বারী ভূঁইয়া সম্প্রতি ফেসবুকে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির কিছু আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনে নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর আসামিদের পক্ষে আইনি সেবা দিচ্ছেন বিএনপির কিছু আইনজীবী।

এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ আদালতের পিপি ও বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদ জাকির বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় কিছু কিছু মামলায় প্রথমদিকে বিএনপিপন্থি কিছু আইনজীবী দাঁড়িয়েছিলেন। পরে গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সমালোচনা হওয়ায় এখন আর বিএনপিপন্থি কোনো আইনজীবী দাঁড়াচ্ছেন না।’ এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধান বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় করা মামলাগুলোতে শত্রুতামূলকভাবে অনেক বিএনপি নেতাকর্মীকেও আসামি করা হয়েছে। বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা শুধু ওইসব মামলায়ই দাঁড়াচ্ছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত