রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) ওপর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অযৌক্তিক সিস্টেম লস চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগে উচ্চ আদালতে রিট করার পর জিটিসিএলের ট্রান্সপোর্ট সুপারভাইজার মো. লুৎফর রহমানকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। এই বদলির ক্ষেত্রে জিটিসিএল কর্তৃপক্ষ শ্রম আইন মানেনি বলেও রয়েছে অভিযোগ।
জ্বালানি বিভাগ এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) পাশ কাটিয়ে গত বছরের জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠার ২৯ বছর পর অনেকটা হঠাৎ করেই জিটিসিএলের ওপর গ্যাস সঞ্চালন লাইনে ৩ শতাংশ সিস্টেম লস চাপিয়ে দেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার। এ নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চিঠি চালাচালি ও ঠাণ্ডা লড়াই চলছে।
বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন জিটিসিএলের ট্রান্সপোর্ট সুপারভাইজার এবং প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিক-কর্মচারী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. লুৎফর রহমান। এটি আমলে নিয়ে গত ১১ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ জিটিসিএলের ওপর পেট্রোবাংলার দেওয়া গ্যাস সঞ্চালন লাইনের সিস্টেম লস তিন মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী আদেশ ও রুল দেয়।
এর আগে কমিশনের নির্দেশ না মেনে জিটিসিএলের ওপর অযৌক্তিক ওই সিস্টেম লস চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাখ্যা চেয়ে চলতি মাসের শুরুতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি।
লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১৩ নভেম্বর রাতে উচ্চ আদালতের আদেশ হাতে পান। পরদিন জিটিসিএল এবং পেট্রোবাংলায় বিষয়টি জানাজানি হয়। ওইদিন দুপুরেই তাকে ঢাকার আমিনবাজার থেকে রাজশাহীতে তাৎক্ষণিক বদলি করে চিঠি দেয় জিটিসিএল কর্তৃপক্ষ।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে অযৌক্তিক সিস্টেম লস চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কারণেই পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের নির্দেশে আমাকে অন্যায়ভাবে বদলি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শ্রম আইনও মানা হয়নি।
বাংলাদেশ শ্রম আইনের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে (ট্রেড ইউনিয়ন ও শিল্প সম্পর্ক) ১৮৭ ধারায় বলা আছে ‘কোন ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কোন কর্মকর্তাকে তাহাদের সম্মতি ব্যতিরেকে এক জেলা হইতে অন্য জেলায় বদলি করা যাইবে না।’
লুৎফর রহমান জিটিসিএলের ট্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। তা ছাড়া তার বিরুদ্ধে জিটিসিএল কর্তৃপক্ষ কোনো অভিযোগ করেনি। এমন পরিস্থিতি তাকে শাস্তিমূলক বদলি করে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিটিসিএলের কোম্পানি সচিব ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ডিভিশন) কাজী হাসান মাসুদ গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে লুৎফর রহমানকে বদলি করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের নির্দেশে বদলি এবং এ ক্ষেত্রে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বদলির বিষয়ে আগামীকাল (আজ) আরও ভালোভাবে দেখে তারপর কথা বলতে পারব।’
এ বিষয়ে কথা বলতে জিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুখসানা নাজমা ইছহাকের মোবাইলে গতকাল একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আদালতে রিট করা এবং তাৎক্ষণিক বদলির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। ফলে কাউকে বদলির বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আদেশ অমান্য করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) ওপর অযৌক্তিক সিস্টেম লস চাপিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে ব্যাখ্যা দিতে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে বিইআরসি।
কমিশনের সচিব ব্যারিস্টার মো. খলিলুর রহমান খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ২০২২ সালের ৪ জুন কমিশন কর্তৃক জিটিসিএলের গ্যাস সঞ্চালন চার্জ শূন্য বিবেচনা করা হয়। পরে বিইআরসি আইনের সংশোধিত ধারা ৩৪ক কার্যকর থাকার সময় (১ ডিসেম্বর, ২০২৩ থেকে ২৬ আগস্ট ২০২৪) সরকার ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে জিটিসিএলের সঞ্চালন চার্জ পুনর্নির্ধারণ করে। ওইসময় তাদের সঞ্চালন লস পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি সরকার। কিন্তু পেট্রোবাংলা ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি একটি সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জিটিসিএল এর ওপর সিস্টেম লস আরোপ করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী ইউনিয়ন ও জিটিসিএল অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো ওই চিঠিটি গত ৪ নভেম্বর গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটির ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।
গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত এবং আমদানি করা গ্যাস সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে ছয়টি বিতরণ কোম্পানির কাছে সরবরাহ করে জিটিসিএল। এরপর বিতরণ লাইনের মাধ্যমে তা গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় বিতরণ কোম্পানিগুলো।
গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় দেশে বছরে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকার গ্যাস অপচয় হচ্ছে। এটিকে ‘সিস্টেম লস’ বা কারিগরি ক্ষতি বলা হলেও বাস্তবে এর বেশিরভাগই বিতরণ কোম্পানিগুলোর অবৈধ সংযোগের কারণে চুরি হওয়া গ্যাস বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগের পেছনে গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ঠিকাদার, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা জড়িত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
জিটিসিএল থেকে গ্যাস নেওয়ার পর বিতরণ লাইনে ঘাটতি পাওয়া গেলে তা সব বিতরণ কোম্পানির মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার নিয়ম চলে আসছিল প্রায় ২৯ বছর ধরে। এ নিয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোর আপত্তি ছিল। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহের প্রতিটি পয়েন্টে মিটার বসানোর প্রস্তাব ওঠে। এ নিয়ে পেট্রোবাংলার গঠিত কমিটির পর্যবেক্ষণে সঞ্চালন লাইনে প্রায় ৩ শতাংশ সিস্টেম লস হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এরপর জিটিসিএলের ওপর ওই সিস্টেম লসের দায় চাপানো হয়।
তবে জিটিসিএল কথিত এই লস নিতে অপারগতা প্রকাশ করে তা প্রত্যাহার করতে দফায় দফায় চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলাকে। কিন্তু পেট্রোবাংলা তাতে রাজি না হওয়ায় জিটিসিএলের আর্থিক ক্ষতি বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞ এবং জিটিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রাহকের কাছে গ্যাস বিক্রি না করায় খুবই সামান্য পরিমাণে কারিগরি ক্ষতি ছাড়া বড় ধরনের সিস্টেম লসের সুযোগ নেই জিটিসিএলের। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস চুরি হচ্ছে, তা সমন্বয় করতেই অযৌক্তিকভাবে এই লোকসান চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে গ্যাস সঞ্চালন কোম্পানির ওপর।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির মধ্যে মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস পরিমাপ করে সরবরাহ করতে বিইআরসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে এখানে। পেট্রোবাংলা কিংবা কারও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়নি।
এদিকে হঠাৎ করে লোকসানের পরিমাণ আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ায় জিটিসিএলের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের দানা বাঁধতে থাকে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পেট্রোবাংলার ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করেন জিটিসিএলের কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে গত ১৯ আগস্ট পেট্রোবাংলার এক আদেশে বলা হয়, জিটিসিএলের সিস্টেম লসের বিষয়টি মন্ত্রণালয়/উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে স্থগিত করা হলো। তবে গত ২২ অক্টোবর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, সিস্টেম লস প্রত্যাহার করা হয়নি। এই দায় জিটিসিএলকেই নিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে এক বছর ধরে তদন্ত করে বাস্তবে যে প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেটিই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
জিটিসিএল সূত্রমতে, বর্তমানে ৬৬টি মিটারের মাধ্যমে গ্যাস সঞ্চালন করা হয়। যার মধ্যে জিটিসিএলের নিজস্ব মিটার রয়েছে ২১টি। এর বাইরে সঞ্চালন লাইনের মাঝখান থেকে ট্যাপিং করে নেওয়া গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাসের ২০টি, বাখরাবাদের ৮টি, জালালাবাদের ১০টি, কর্ণফুলীর ২টি এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির ৫টি মিটার রয়েছে। এসব মিটারের মধ্যে আবার প্রায় ১০টি মিটার রয়েছে বিতরণ কোম্পানির গ্রাহকের আঙিনায়।
জিটিসিএলের অভিযোগ, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এই ৪৫টি মিটারের মাধ্যমে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ গ্যাস বিতরণ করা হচ্ছে। এ মিটারগুলো বিতরণ কোম্পানির এবং সেগুলোয় রিডিং নেওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণও তারাই করে থাকে। ফলে তারা সঠিকভাবে রিডিং নিচ্ছে কি না বা মিটারে কারসাজি করছে কি না, তা ধরার উপায় নেই জিটিসিএলের।
একনজরে আজকের দেশ রূপান্তর (১৭ নভেম্বর)
সেই জাহাজে পাকিস্তান থেকে আলু-পেঁয়াজসহ যা যা এলো
পল্টনে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, প্রাণ গেল অটোরিকশা যাত্রীর
ঘরেও ঢুকে যাচ্ছে অপরাধীরা