জার্মানির নির্বাচনেও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন নির্বাচন। সামাজিক মাধ্যম আর অর্থের উৎস ফলাফল নির্ধারণ করে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মতো। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
জার্মানিতে আগাম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন জোটে তিক্ততা দেখা দেওয়ায় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আসছে বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি জার্মান পার্লামেন্টে নির্বাচন হবে। জার্মানির ২১তম সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। কিন্তু গত ৬ নভেম্বর জোটভুক্ত তিন শরিক দলের সভার পর চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ অর্থমন্ত্রী ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডনারকে মন্ত্রী পদ থেকে বরখাস্ত করেন। নতুন বাজেট ও অর্থনৈতিক নীতির বিষয়ে তিনটি দল নিয়ে গঠিত জার্মান সরকারে বিভক্তি দেখা দেয়। যার প্রেক্ষিতে এ ভাঙন। যে ভাঙনের সূত্র ধরে আগাম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলো। তবে এ নির্বাচনকে ইতিমধ্যে তাড়া করছে মার্কিন নির্বাচনের ভূত। মার্কিন নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব রাখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এ ছাড়া নির্বাচনে যারা অর্থ ব্যয় করে, তাদেরও প্রভাব ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচনে। আর এ দুই প্রপঞ্চের প্রতীক ইলন মাস্ক।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে বলছে, মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর থেকে জার্মান নির্বাচনে দলীয় প্রচারে সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা কেমন হতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, জার্মানির ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর নেতারা জনপ্রিয় দলগুলোর উত্থানে নার্ভাস। চরম ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি দুই রাজ্য থুরিংগিয়া এবং স্যাক্সনির সাম্প্রতিক নির্বাচনে ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। যা টিকটকের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর ফলে সম্ভব হয়। অস্ট্রিয়ার ইনসব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ এবং মিডিয়া আইনের বিশেষজ্ঞ ম্যাথিয়াস কেটেম্যান বলেন, জনমত এবং গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সোশ্যাল মিডিয়ার কী প্রভাব রয়েছে তা এক কথায় বলা অসম্ভব। তবে এটি স্পষ্ট যে, আরও বেশি সংখ্যক মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে এবং ভোটারদের প্রভাবিত করতে ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও বলেন, অতি ডান এবং বাম দলগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ভালো করার প্রবণতা রাখে। কারণ তাদের কাছে সহজ গল্প বলার কৌশল থাকে, যার মাধ্যমে তাদের অ্যালগরিদমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়।
এখানেও ইলন মাস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছেন ইলন মাস্ক। তার সমর্থন ছিল ট্রাম্পের প্রতি। ট্রাম্প জিতেছেন বিপুল ভোটে। জার্মানির পর্যবেক্ষকরা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এবং প্ল্যাটফর্ম এক্স-এর সিইও ইলন মাস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব সম্পর্কেও সতর্ক রয়েছেন। ৬ নভেম্বর জার্মানির ক্ষমতাসীন জোট সরকারে ভাঙনের পর মাস্ক জার্মানির বামপন্থি নেতাদের ‘মূর্খ’ বলে উল্লেখ করেছেন। যে ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইতিমধ্যে জার্মান ভাইস চ্যান্সেলর এবং অর্থনীতি মন্ত্রী রবার্ট হ্যাবেক ছয় বছর বিরতির পরে মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্মে আশ্চর্যজনকভাবে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তিনি মনে করেন, সাবেক টুইটার বা বর্তমান এক্স-কে ‘পপুলিস্টদের’ কাছে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। ইতিমধ্যে জার্মান ফুটবল ক্লাব সেন্ট পাওলি সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ইলন মাস্কের মালিকানাধীন ওয়েবসাইটটি একটি ‘ঘৃণা যন্ত্র’। তাদের মতে, এক্স জার্মানির আসন্ন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। হামবুর্গভিত্তিক বামপন্থি ক্লাবটি বর্তমানে বুন্দেসলিগায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এক্স-এ তাদের ২৫ লাখ অনুসারী ছিল। যারা নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম ব্লুস্কিতে চলে যাবে। ব্লুস্কি টুইটারের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডরসি দ্বারা তৈরি একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর অনেক জার্মান নাগরিক এক্স ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। তারা থ্রেডস এবং ব্লুস্কিসহ প্রতিদ্বন্দ্বী পরিষেবাগুলোতে অ্যাকাউন্ট খুলছেন। গত সপ্তাহে ১ মিলিয়নেরও বেশি নতুন ব্যবহারকারী পেয়েছে এসব সামাজিক মাধ্যম। জার্মানির এ ফুটবল ক্লাবের অভিমত, মাস্ক এক্স-কে একটি ঘৃণার যন্ত্রে রূপান্তরিত করেছে। বর্ণবাদ এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো যাচাই না করেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অপমান এবং হুমকি বাকস্বাধীনতা হিসেবে বিক্রি করা হয়। তারা বলেছেন, এটা অনুমান করা হচ্ছে যে, এক্স আসন্ন জার্মান নির্বাচনী প্রচারের সময় কর্র্তৃত্ববাদী, অপমানবাদী এবং অতি-ডান বিষয়বস্তু প্রচার করবে, এটি জনগণের বক্তৃতাকে বিকৃত করবে।
নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
ডয়চে ভেলে তাদের প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, জার্মানিতে আসন্ন ফেডারেল নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদেশি স্টেকহোল্ডাররা বট ফার্ম, টেলিগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো বার্তা প্রেরণের অ্যাপগুলো ব্যবহার করে প্রচারণায় প্রভাব ফেলতে পারে। জার্মানির উগ্র ডানপন্থি এএফডি ও বিএসডব্লিউ রাশিয়াপন্থি রক্ষণশীল, অভিবাসনবিরোধী, জলবায়ু সুরক্ষাবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কোটম্যান বলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ আমরা জানি যে, রাশিয়া জার্মানির কিছু রাজনৈতিক দলকে অন্যদের চেয়ে বেশি পছন্দ করে। তারা জার্মান সমাজের মধ্যে মেরুকরণের প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে চায় এবং এটি এমন একটি হুমকি, যা সম্পর্কে আমাদের সংসদ নির্বাচনের আগে গভীরভাবে সচেতন হতে হবে।’ ডয়চে ভেলে আরও জানাচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইতিমধ্যে ডিজিটাল পরিষেবা আইনসহ (ডিএসএ) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ডিজিটাল মার্কেট প্লেসের জন্য একটি বিস্তৃত নিয়মনীতি চালু করেছে। যার অন্যতম উদ্দেশ্য অনলাইনে ভুল তথ্যের অপপ্রচার ও বেআইনি কার্যক্রম ঠেকানো। জুলাইয়ে জারি করা প্রাথমিক অনুসন্ধানে ইইউ নিয়ন্ত্রকরা এক্স ডিএসএ লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেন। ম্যাথিয়াস কেটম্যান মনে করেন, এ মুহূর্তে আইনটি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হবে এবং ফেব্রুয়ারিতে জার্মান ফেডারেল নির্বাচনের সময়ে তা কার্যকর হবে না। তিনি বলেন, ‘এক্স-এর মতো কিছু প্ল্যাটফর্ম ইইউ নিয়মের সঙ্গে কোনোরকম সহযোগিতা করছে বলে মনে হচ্ছে না। তাই এ প্ল্যাটফর্মকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং ইইউ নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে।’ ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন নীতিনির্ধারণে ইলন মাস্কের ভূমিকা বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে আরও কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত জেডি ভ্যান্স ইইউ এক্স-কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর জন্য সমর্থন প্রত্যাহার করবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। যেহেতু আরও বেশিসংখ্যক ভোটার, বিশেষত তরুণ ভোটাররা সামাজিক মাধ্যমে রাজনীতি ও বিশ্ববিষয়ক বিষয়ে নিজেদের যুক্ত করছেন, তাই পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ম্যাথিয়াস কেটম্যান।
খরচ
মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পকে নির্বাচিত করার জন্য রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি বা প্যাককে ১১৯ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি দান করেন ইলন মাস্ক। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের ভোটারদের ভোটে যেতে মিলিয়ন ডলার পুরস্কারের প্রস্তাবও দিয়েছেন। মাস্কের বর্তমানে প্রায় ২৯০ বিলিয়ন ডলার সম্পদ রয়েছে। তিনি চার বিলিয়ন ডলারে এক্স কিনে তা অযথাই খরচ করেছেন ট্রাম্পের পেছনে। এক্স অলাভজনক এবং সম্পূর্ণ অকার্যকর হলেও মাস্কের কোনো লাভ নেই। তারপরও তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন। বলা হয়ে থাকে, মার্কিন নির্বাচনে যারা অর্থ ব্যয় করে সরকার পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণ থাকে বেশি। ডয়চে ভেলে তাদের প্রতিবেদনে বলছে, নির্বাচনী প্রচারের খরচে জার্মানিতে কোনো ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া নেই। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করে। তারপরও বিশে^র অনেক দেশের তুলনায় জার্মানিতে নির্বাচনী খরচ খুবই কম। ২০১৯ সালে ভারতের নির্বাচনী খরচ ছাপিয়ে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। ২০২৪ সালে অবশ্য ভারতের নির্বাচনী খরচ রেকর্ড গড়ে বলে অনুমান। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়েছে ওই নির্বাচনে। তবে জার্মানির পরিস্থিতি ভিন্ন। জার্মানিতে রাজনৈতিক দলের খরচের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের খরচ আলাদা হিসাব করার চল নেই। কারণ জার্মানদের মতে, এটাই স্বাভাবিক যে, একটি রাজনৈতিক দল তার সাধ্যের মধ্যে থেকে প্রচারের কাজ করবে। ফলে নির্বাচনের খরচও ধরা থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর বার্ষিক বাজেটে। জার্মানিতে রাজনৈতিক দলের টাকা আসে মূলত পাঁচটি উৎস থেকে। সেগুলো হলো সদস্য পদের চাঁদা, নির্বাচিত সদস্যদের চাঁদা, জনসাধারণের অনুদান, রাষ্ট্রের থেকে পাওয়া সাহায্য ও অন্যান্য আয়, যেমন স্পনসর বা শেয়ার বা অন্যান্য সম্পত্তি। কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা এককভাবে যদি ৫০ হাজার ইউরোর বেশি অর্থ কোনো দলকে দেন, তাহলে সেই তথ্য জানাতে হবে জার্মান সংসদ বুন্ডেসটাগকে। বুন্ডেসটাগের দায়িত্ব, এমন তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা। কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা চাইলে যথেচ্ছ অর্থ রাজনৈতিক দলকে দান করতে পারলেও পরিসংখ্যান বলছে, জার্মানিতে রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের খুব ছোট অংশ আসে ব্যক্তিগত চাঁদা থেকে। ২০২১ সালে এক সফটওয়্যার সংস্থা গ্রিন পার্টিকে এক মিলিয়ন ইউরো দান করে। এটিই এখন পর্যন্ত জার্মান রাজনীতিতে সর্বোচ্চ চাঁদা।
ফলে টাকা দিয়ে জার্মান নির্বাচনকে প্রভাবিত করার সুযোগ কম। তবে এখানে একটি সমালোচনা রয়েছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলকে টাকা দেওয়া নিয়ে। ডয়চে ভেলে বলছে, রাষ্ট্র যখন দলকে টাকা দেয় তখন তা কী বার্তা দেয়? এ প্রশ্ন সাম্প্রতিক সময়ে বহু জার্মানদের ভাবাচ্ছে। তাদের প্রশ্ন, তবে কি জার্মান রাষ্ট্রের চোখে গণতন্ত্রপন্থি এসপিডি, পরিবেশবান্ধব গ্রিন পার্টি ও নব্য নাৎসি দল এএফডি, সবাই এক? জার্মানির বিশেষ ইতিহাসের কি বিবেচিত হবে না, যখন জনগণের টাকা এমন দলের প্রচারে খরচ হয়, যাদের বিরুদ্ধে জার্মান সংবিধান বিরোধিতারও অভিযোগ রয়েছে? এসব প্রশ্নের সমাধান জরুরি আসন্ন নির্বাচনের জন্য। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাশাপাশি যদি জার্মানির উগ্র দলগুলো সরকারি আর্থিক সহায়তাও পায়, তাহলে অন্য গণতান্ত্রিক দলগুলো সংকটে পড়ে যাবে। উগ্রবাদ ঠেকানো কঠিন হয়ে যাবে জার্মানির জন্য।
