ব্যবধানটা মাত্র মাস তিনেকের। আগস্টের ৮ তারিখে চিরবিদায় নিয়েছিলেন সাইদুর রহমান প্যাটেল। তার ঠিক ১০০ দিন পর চোখ বুজলেন জাকারিয়া পিন্টুও। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই দলের প্রতিষ্ঠা নিয়ে নানা সদস্যের নিজেদের ভেতর কাদা ছোড়াছুড়িতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল হারিয়েছে গরিমা। মূল দ্বন্দ্বটা ছিল যে দুজনের ভেতর, সেই প্যাটেল আর পিন্টু চোখ বুজলেন মাস তিনেকের ব্যবধানে। অমীমাংসিত তর্কটা হয়তো চলবে পরপারে, নাকি নশ্বর দেহের সঙ্গে বিতর্ককেও তারা ছেড়ে গেলেন মর্ত্যইে।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বেশিরভাগ ফুটবলারই এই দল তৈরির স্বপ্ন দ্রষ্টা হিসেবে সাইদুর রহমান প্যাটেলের নাম বলেন। যেটা মানতেন না জাকারিয়া পিন্টু। একাধিকবার গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন তার সংস্করণ, ‘এই দলটির স্বপ্ন দ্রষ্টা আলী ইমাম। মূল লোক তিনি। সাইদুর রহমান প্যাটেলের কোনো ভূমিকা ছিল না।’ এখন অনেকে বলেন, ‘এই করেছি, ওই করেছি। আমি ওকে কিছু করতে দেখিনি। যারা দেখেছে, তারা বলুক আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি দেখিনি। প্রস্তাব তো যে কেউ করতে পারেন। প্রতাপ (শংকর হাজরা) করতে পারেন। আলী ইমাম করতে পারেন। প্রস্তাব করার মানে তো এই না যে, প্যাটেল প্রতিষ্ঠাতা। আমি তা মানি না।’ বছর ছয়েক আগে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এসব কথাই বলেছিলেন পিন্টু। এরপর থেকে তো তিনি অসুস্থই ছিলেন দীর্ঘদিন। হাল ছেড়ে দিয়েছে হৃৎপিন্ড, যকৃৎসহ অনেকগুলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। ৯০ মিনিটের খেলার অধিনায়ক জীবনের মাঠে ৯০-তে যেতে পারলেন না, ৮১-তেই বেজে গেল শেষ বাঁশি।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে কিংবদন্তিতুল্য মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার কথা পিন্টুর। কিন্তু তেতো সত্যিটা হচ্ছে, স্বাধীন বাংলা ফুটবলের দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গেই সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল তার। ফুটবলার পিন্টুর ক্যারিয়ার শুরু ১৯৫৮ সালে। ইস্ট এন্ড, ওয়ান্ডারার্সে খেলার পর ১৯৬১ সালে যোগ দেন মোহামেডানে। ১৯৭৫ পর্যন্ত সেখানে খেলে অবসর। তার পরবর্তী ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সতীর্থদের। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক হন তিনি, ভাইস প্রেসিডেন্টও। ওই সময় দলের সদস্যদের সুবিধা আদায়ের চেয়ে নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেছেন বলে অভিযোগ অনেকের। তার স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া নিয়েও সতীর্থদের ক্ষোভ। এই ব্যাপারে আত্মপক্ষ সমর্থনে পিন্টু সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি ওই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে পারতাম। কিন্তু যদি প্রত্যাখ্যান করে বলতাম স্বাধীন বাংলা দলকে তা দিতে হবেÑ তাহলে আজ এখানে সাক্ষাৎকার নাও দিতে পারতাম। আমাকে হয়তো মেরে ফেলা হতো।’ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সঙ্গে এক সময় জড়িয়েছিলেন। হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, সহসভাপতি। ১৯৯৬ সালে ‘জনতার মঞ্চ’ তৈরির সময়ও সরকারকে সমর্থন করে পিন্টু বিবৃতি পর্যন্ত দিয়েছেন। এক সময় বাফুফের সভাপতি পদেও নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন।
সাইদুর রহমান প্যাটেলের সঙ্গে তার মূল দ্বন্দ্বটাই ছিল কে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিষ্ঠাতা এই প্রশ্নে। যে দ্বন্দ্বের জের ধরে কলকাতার কারনানি ম্যানশন ছেড়ে প্যাটেল চলে যান রণাঙ্গনে, ফুটবল পায়ে নয় অস্ত্র হাতেই যুদ্ধ করতে। এরপর দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু তাদের মতের মিল আর হয়নি। হয়তো পরপারে সব ঈর্ষা আর ব্যক্তিগত ক্ষোভ ভুলে এক হবেন দুজনে।
বিতর্কের অংশটুকু বাদ দিলে পিন্টুর জীবনটা যেকোনো ফুটবলারের জন্যই স্বপ্নের মতো। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক, বাংলাদেশ জাতীয় দলেরও প্রথম অধিনায়ক। গর্ব করে বলতেন, ‘আমি পেলে ও ম্যারাডোনার চেয়ে একদিক দিয়ে ভাগ্যবান। আমার যা রেকর্ড আছে, তা তাদের নেই! তারা ঠিকই বিশ্বকাপ জিতেছেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার, কিন্তু তাদের কারও ফুটবল খেলে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রাখার সুযোগ হয়নি! কেননা তাদের তো স্বাধীন বাংলা দল গঠনের সুযোগই হয়নি। এই জায়গায় আমি এগিয়ে আছি (হেসে হেসে)। আমার রেকর্ড থাকবে আজীবন। আমার মনে হয় না ভবিষ্যতে এমন কোনো দল আর হবে।’
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল হয়ে গেল বাংলাদেশ জাতীয় দল, সেই দলেরও অধিনায়ক পিন্টু। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দুটি জাতীয় দলেই খেলেছেন। শুধু ফুটবলার নন, ১৯৭৭ ও ১৯৮৭ সালে কিছুদিন মোহামেডানকে কোচিংও করান জাকারিয়া পিন্টু। ১৯৭৯ সালে ঢাকা সফরে আসা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্লাব দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। ১৯৮০ সালে কুয়েতে সপ্তম এশিয়া কাপের চূড়ান্ত পর্বে ছিলেন বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার। বর্ণময় এক ফুটবল ক্যারিয়ারই। যার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৫ সালে পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৭৮ সালে। এমন একজন মানুষ হতে পারতেন ফুটবলের অভিভাবক, ছায়াদায়ী বটবৃক্ষও। কিন্তু বিতর্ক আর বিভেদ তাকে বানিয়ে রেখে দিল বনসাই।
