শরীরে বুলেট নিয়ে কাতরাচ্ছেন তারা

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:১৫ এএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি এখনো শরীরে নিয়ে ধুঁকছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের কয়েকশ শিক্ষার্থী ও তরুণ। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বাড়িতে কাতরাচ্ছেন সময়ের এসব সাহসী সন্তান। দিন যত যাচ্ছে, ততই ঝুঁকি বাড়ছে তাদের। তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের শরীর থেকে দ্রুত গুলি অপসারণ করা না হলে অনেকেই দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়বেন। কাউকে কাউকে বরণ করতে হতে পারে স্থায়ী পঙ্গুত্ব। অথচ তাদের অনেকেরই নেই অস্ত্রোপচার করে গুলি অপসারণের সামর্থ্য। এ অবস্থায় তাদের চিকিৎসা সহায়তায় পাশে নেই সরকার, স্থানীয় সমন্বয়ক ও রাজনৈতিক দলের নেতারা।

দেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই ভৈরবে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সেদিন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসেন এবং তাদের দাবির পক্ষে সড়ক-মহাসড়কে অবরোধ তৈরি করেন। সেই অবরোধ প্রতিরোধ করতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালান। কিন্তু তাদের হামলা ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে টিকতে পারেনি। তখন তাদের ইন্ধনে পুলিশ বাহিনী নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে ছররা গুলি চালায়। এতে কয়েকশ ছাত্র-জনতা গুলিবিদ্ধ হন। সেই আহতদের উদ্ধার করে আশপাশের স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিলেও পুলিশের ভয়ে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়। সরকারি হাসপাতালে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের পাহারা থাকায় সেখানে চিকিৎসাসেবা নিতে যেতে পারেননি আহতরা। পরে তারা বিভিন্ন পল্লী চিকিৎসকের চিকিৎসা নিয়েছেন। এতে করে ক্ষতস্থান শুকিয়ে গেলেও, শরীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য গুলি রয়ে যায়। এখন সেই গুলির প্রভাবে শরীর জ্বালাপোড়া ও ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছেন তারা।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যোগাযোগ করেন। কিন্তু ক্ষতস্থান শুকিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিপত্তি। চিকিৎসকরা বলছেন, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীরের ভেতরে থাকা গুলি বের করে আনতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। আর এই প্রক্রিয়ায় যে ব্যয় হবে, আহত অনেকের পরিবারের পক্ষেই তা বহন করা সম্ভব নয়।

কমলপুর গাছতলাঘাট এলাকার ছাত্রদলকর্মী শাহরিয়ার জিসান ও উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের বধূনগর গ্রামের পরিবহন শ্রমিক দুর্জয় মিয়া জানান, তারা রোদে যেতে পারেন না। গরম সহ্য করতে পারেন না। তিন-চারটা ফ্যান চারপাশে রেখে বাতাস নিলেও, শরীরের জ্বালা কাটে না। তারা সুচিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চান।

স্থানীয় সমন্বয়ক ও ছাত্রদল নেতা সানি তালুকদার বলেন, ‘আমি ৭০-৮০টি বুলেট শরীরে বহন করছি। এর চেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমার আহ্বানে স্থানীয় ছাত্র-জনতা আন্দোলনে অংশ নিয়ে আহত হয়েছেন। অথচ আমি তাদের জন্য কিছু করতে পারছি না। এদিকে অভিভাবকরা আমাকে দোষারোপ করছেন যে তাদের সন্তানরা আমার জন্য আহত হয়েছেন। আমি এখন পরিচিতজনদের কাছ থেকে একপ্রকার পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’

শাহরিয়ার জিসানের বাবা মো. আক্তারুজ্জামান লিটনের অভিযোগ, এত দিন কেটে গেলেও সরকারের তরফ থেকে কোনো সহায়তা পাননি তারা। স্থানীয় সমন্বয়করাও খোঁজখবর নিচ্ছেন না আহতদের। পাশে নেই বিএনপি নেতাকর্মীরাও। তিনি বলেন, ‘জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করে আমাদের কঁচিপ্রাণ বাচ্চাগুলো মরতে বসেছে। অথচ কারও কোনো মাথাব্যথা নেই এ বিষয়ে।’

দুর্জয় মিয়ার মা তাকলিমা বেগম বলেন, ‘আন্দোলন করে আমার ছেলে বুলেটবিদ্ধ হয়ে ঘরে শুয়ে কাতরাচ্ছে। আমার দিনমজুর স্বামীর পক্ষে চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে না। আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য সরকারের সহায়তা চাই।’

ভৈরব উপজেলা বিএনপি সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, তিন শতাধিক ছাত্র-জনতা আহত হয়েছেন আন্দোলনে। এর মধ্যে কিছুসংখ্যক চিকিৎসা নিয়েছেন ঢাকা ও ভৈরবে। তাদের কয়েকজনের চিকিৎসা দলীয়ভাবে করা হয়েছে। গুরুতর ২৫ জনের নামের তালিকা পাঠানো হয়েছে ক্ষতি পূরণের জন্য। তবে তারা কেউই এখনো টাকা পাননি।

ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. বুলবুল আহম্মদ জানান, সরকারিভাবে নির্দেশনা এসেছে আহতদের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর জন্য। তাই যারা এখনো গুলি বহন করছেন শরীরে, তারা যেন দ্রুত যোগাযোগ করেন।

এদিকে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারিভাবে স্থানীয় সমন্বয়ক ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে আহতদের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সেটি চূড়ান্ত হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত