ঢাবি ছাত্রদলের ২৪২ সদস্যের কমিটি নিয়ে যত অভিযোগ

  • অনেকেই সক্রিয় হয়েছেন ৫ আগস্টের পর
  • দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ও চাকরিজীবীরাও পেয়েছেন পদ
  • ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততাসহ বিতর্কিত ৬ নেতাকে অব্যাহতি
আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৪, ১০:৩৩ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। ২৪২ সদস্যের এই পূর্ণাঙ্গ কমিটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি কারও কারও বিরুদ্ধে রয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততার অভিযোগ, রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিদ্রুপকারীও। এ ছাড়া কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন বিবাহিত, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকা চাকরিজীবীরাও। গত ৫ আগস্ট রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন, এমন সদস্যও রয়েছেন ১০০ জনের বেশি।

বিএনপির এই ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। নতুন করে যারা ছাত্রদলে যুক্ত হয়েছেন, তাদের নিয়েই কমিটি গঠন করা হয়েছে। যাতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখা যায়। ছাত্রদলকে দেখভাল করা বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতার নির্দেশে কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে আলোচনা না করেই তাড়াহুড়ো করেই এ কমিটি ঘোষণা করায় বিতর্কিতরা বেশি সুযোগ পেয়েছেন বলে মনে করেন সংগঠনটির কয়েকজন নেতা।

গত বৃহস্পতিবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেন। এরপরই বিতর্ক শুরু হয়। কমিটি ঘোষণার পর নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দের আমেজ থাকার কথা থাকলেও তা ছিল অনুপস্থিত। উল্টো ছাত্রদলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীরা এই কমিটি ঘোষণায় মনঃক্ষুন্ন হয়েছেন। তারা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে এত এত বিতর্কিত ও অপরিচিত নিয়ে কোনোভাবেই কমিটি হতে পারে না। নতুন এই কমিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে হতাশা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

পূর্ণাঙ্গ কমিটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কমিটিতে থাকাসহ সংগঠনটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী অন্তত ১০ নেতাকর্মী পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন পূর্ণাঙ্গ কমিটির ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক সাইফ উল্লাহ সাইফ, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক রঞ্জন রায়, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাহদী ইসলাম নিয়ন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম রিমন, কাজী শাকিব মিয়া, সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং রায়হান হোসেন। এ ছাড়া বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের উপ-মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক বজলুর রহমান বিজয় পেয়েছে ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পাওয়ার পর ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের অংশগ্রহণের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও তাদের মধ্যে কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছেন।

বিবাহিত, চাকরিজীবী এবং রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, এমন অন্তত আটজন পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন সহসভাপতি মিরাজ ইকবাল খান। তিনি ২০১৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় এবং বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে একটি গার্মেন্টসে চাকরিরত। সহসভাপতি আব্দুল্লাহ আল নাঈম বর্তমানে ইনসেপ্টা গ্রুপে কর্মরত। আরেক সহসভাপতি সুলতান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন সিদ্দিক ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচন ছাড়া তার আগে ও পরে ছাত্রদলের রাজনীতিতে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিলেন বলে জানা যায়। অন্য এক সহসভাপতি আব্দুর রহমান সাজ্জাদ চাকরিতে কর্মরত থাকায় বিগত সময়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। নবগঠিত কমিটির সদস্য (সহসভাপতি পদমর্যাদা) ইফতেখার আল আমিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঁচ বছর ধরে চাকরিরত থাকায় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় বলে অভিযোগ আছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিবাহিত বলেও অভিযোগ আছে।

এ ছাড়া প্রবাসে অবস্থান করে কমিটিতে সহসভাপতির পদ পেয়েছেন কাউসার আলম রাসেল, যিনি ২০১৯ সালের মাঝামাঝি থেকে জাপানপ্রবাসী। কমিটি ঘোষণার পর তিনি দেশে এসেছেন। নবগঠিত কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক ফারহান খান, যিনি ২০২০ সাল থেকে নেদারল্যান্ডসে বসবাস করছেন।

এ ছাড়া ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কমিটিতে পদ পেয়েছেন এমন সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১১০ জন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মৌসুমী শেখ, সহ-সাধারণ সম্পাদক মারুফুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, রুবেল পারভেজ, সাজিন আহমেদ, অনিরুদ্ধ রায়, ফাতেমা তুজ জোহরা, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসির আরেফিন তন্ময়, আল-আমিন মীরা, রানা আহমেদ, মো. আবু হোসাইন সিয়াম, মুজিবুর রহমান মাইকন, চিন্ময় বর; ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক চেমন ফারিয়া ইসলাম মেঘলা, সহ-ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক রায়হানা পারভীন, সদস্য রায়হানুল আবেদীন, জাহিদ হাসান, মুস্তাকিম আলী, কামরুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ সেকান্দার, মাজহারুল হক রাকিব, সাব্বির আহমেদ, মাহবুবুর রহমান, উসমান দেওয়ান, মাহবুবুর রহমান জয়, রাসেল রানা, আলম বাদশা, এমদাদুল হক প্রমুখ।

এদিকে গত ১৪ নভেম্বর ঢাবি ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হলে, সেই প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সংসদের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পাওয়ার পর ‘নানা অভিযোগ’ আসার কথা জানিয়ে তদন্ত করে ছয়জন নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অব্যাহতি পাওয়ারা হলেন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়া সাইফুল ইসলাম রিমন ও মাহাদী ইসলাম নিয়ন, জেন্ডার ন্যায্যতা ও সমতাবিষয়ক সম্পাদকের পদ পাওয়া সৈয়দা সুকাইনা নাফিসা তরঙ্গ, সহ-পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক সম্পাদকের পদ পাওয়া ইমরান হোসেন এবং সদস্য পদ পাওয়া আব্দুল্লাহ আল মামুন ও রায়হান হোসেন।

এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির সদস্য ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি এ বি এম ইজাজুল কবির রুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক তদন্তে সম্পৃক্ততা পেয়ে ছয়জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছি। আমাদের যাচাই-বাছাই চলছে। আরও যারা বিভিন্নভাবে বিতর্কিত এবং অভিযুক্ত তাদেরও বের করার চেষ্টা করছি। তারপর আমরা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় সংসদে জমা দেব।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই কমিটি নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকা শিক্ষার্থীদের কেন কমিটিতে রাখতে হবে। আর যারা ৫ আগস্টের আগে রাজনীতিতে আসার সাহস দেখাতে পারেননি, তাদের কেন মূল্যায়ন করা হবে। এই কমিটি নিয়ে কোথাও কোনো উচ্ছ্বাস নেই।’

পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদ পাওয়া আরেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলকে বিতর্কিত করেছে। ছাত্রলীগের তেলবাজ, দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিদ্রুপকারীসহ যাদের সঙ্গে ছাত্রদলের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই এমন লোকজনও কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন। ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হয়নি। যারা বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে জীবনবাজি রেখে ছাত্রদলের সব কর্মসূচি পালন করেছেন, তাদের চেয়ে নতুনদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা ঢাবি ছাত্রদলকে পঙ্গু করে একটা সিন্ডিকেটের আধিপত্য বিস্তারের ষড়যন্ত্র।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি ছাত্রদল সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, ‘দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি হলে ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, যার ফলাফল হিসেবে আবাসিক শিক্ষার্থীরা এখনো ট্রমাটাইজড। সে সময় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক মেধাবী, মননশীল ও রাজনীতি-সচেতন শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলের রাজনীতি করতে পারেননি। আর্থসামাজিক নানা অসুবিধার কারণে তারা বাধ্য হয়ে হলে থেকেছেন, কিন্তু জোর করলেও তারা ছাত্রলীগের পদ নেননি, বরং সুযোগমতো আমাদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, দলের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। সে রকম কিছু উৎসাহী কর্মীকেই এই কমিটিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে যারা অত্যুৎসাহী হয়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের কেউ ভুলেও যদি পদে চলে আসেন, তবে কেন্দ্রীয় সংসদের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তানুসারে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হবে।’

একই বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সঙ্গে সঙ্গে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছিলাম। সে কমিটি কাজ করছে। তদন্ত চলমান আছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে ছয়জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি চূড়ান্ত রিপোর্ট পেলে আমরা পরে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত