ইসলাম মানবতার ধর্ম। ইসলাম সাম্যের ধর্ম। ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। আর নবী-রাসুল প্রেরণের বিশেষ উদ্দেশ্যও ছিল এটি। পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা এসেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আমি আমার রাসুলদের নির্দেশনাদি দিয়ে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে নাজিল করেছি কিতাব ও মাপার পাল্লা, যেন মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।’ (সুরা হাদিদ ২৫)
মহান আল্লাহ আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন, মানুষ যেন আকিদা-বিশ্বাস, আখলাক ও আমলের ক্ষেত্রে ন্যায়ের পথে চলতে পারে। শিথিলতা ও বাড়াবাড়ির রাস্তা পরিহার করে চলে। আর মহান আল্লাহ পাল্লা দিয়েছেন যেন লেদদেন ও বেচাকেনায় কমবেশি না করে ইনসাফের রাস্তায় চলে। উভয়ই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ মেজাজের বহিঃপ্রকাশ।
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা আদেশ করেন ইনসাফ, মঙ্গল সাধন ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার এবং নিষেধ করেন অশ্লীলতা, মন্দ কর্ম ও সীমালঙ্ঘন থেকে।’ (সুরা নাহল ৯০) এই আয়াতে তিনটি বিষয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানুষের আকিদা-বিশ্বাস, কর্ম, স্বভাব-চরিত্র, লেনদেন, আবেগ-অনুভূতি সবই ন্যায় ও ইনসাফের মানদণ্ডে নির্ণীত হতে হবে। বাড়াবাড়ি বা শিথিলতার কারণে কোনো দিকে ঝুঁকে বা ওপরে উঠতে পারবে না। কঠিন থেকে কঠিনতর শত্রুর সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও ন্যায়ের পাল্লা ফেলে দেওয়া যাবে না। মানুষ নিজেকে নেকি ও কল্যাণের প্রতীক বানিয়ে অন্যের মঙ্গল কামনা করবে। ইনসাফেরও ঊর্ধ্বে উঠে দয়া ও ক্ষমা এবং সহানুভূতি ও সমবেদনার অভ্যাস গড়বে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের আরও ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ইনসাফের পূর্ণ প্রতিষ্ঠাকারী, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য প্রদানকারী হয়ে যাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা তোমাদের মাতা-পিতা ও আত্মীয়স্বজনের বিপক্ষে হয়। অতএব তোমরা ইনসাফ করার বিষয়ে অন্তরের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।’ (সুরা নিসা ১৩৫)
উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদানকারী ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি নিজেদের পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়ের বিপক্ষে গিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবুও তা করতে হবে। ইসলামি স্কলাররা বলেন, এ কথা বলার কারণ হচ্ছে মানুষকে সতর্ক করা। কারণ তাদের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়েই মানুষ ইনসাফের পথ থেকে বিচ্যুত হয়। যদিও এখানে কিছু শ্রেণির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এর মূল বিষয় হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্ক।
হিংসা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে মানুষ সুবিচারের পথ থেকে সরে আসে। মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আর কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদের সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা ৮)
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) শত্রু-মিত্র, সমর্থক বা বিরোধী, মুসলিম বা অমুসলিম সবার সঙ্গে ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতেন। নিকটাত্মীয় হলেও কোনো রকম পক্ষপাতমূলক বিচার করতেন না। একবার মাখজুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক মহিলা চুরি করল। উসামাহ (রা.) তার ওপর আল্লাহর বিধান কার্যকর না করার সুপারিশ করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি মওকুফের সুপারিশ করছ? এরপর তিনি দাঁড়ালেন এবং লোকদের উদ্দেশে বলেন, হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তীরা এ জন্য ধ্বংস হয়েছে যে, যখন তাদের মধ্যে মর্যাদাশীল কেউ চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করত, তখন তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ!
যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করত, আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম। (সহিহ বুখারি)
