জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ১৭ বছর আগে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রতিষ্ঠানটির কেটেছে প্রায় সাড়ে ১৫ বছর। কিন্তু মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন এ সংস্থাটি। শুরুতে যেমন ‘বি’ স্ট্যাটাসের ছিল, এখনো তাই আছে।
গত বছরের নভেম্বরে জাতিসংঘের ‘ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর)’ বা মানবাধিকারের সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক সম্মেলনে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ (ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন) উপস্থিত ছিলেন না। জাতিসংঘের ১৯৪ সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে তখনকার আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। এর আগে খুব দ্রুত ও তাড়াহুড়ো করে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয় সম্মেলনে। মানবাধিকারকেন্দ্রিক এ আয়োজনে খোদ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। কারণ তখন মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে চাপে ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তাই বিব্রতকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় কমিশনের প্রতিনিধি পাঠানো হয়নি বলে এখনো গুঞ্জন রয়েছে।
প্রসঙ্গত, প্রতি চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের এ সম্মেলনে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বিগত চার বছরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন, পর্যালোচনা ও সুপারিশ করা হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের লক্ষ্য নাগরিকের মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিশ্চিতে জোরালো এবং সোচ্চার ভূমিকা পালন করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নানা সমস্যায় জর্জরিত কমিশনটি দিন দিন দুর্বল ও রুগ্ণ একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ থেকে উত্তরণের চেষ্টাও করেনি টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ। তাদের মতো করে নিয়োগ দিয়েছে চেয়ারম্যান ও সদস্য। নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানদের পাঁচজনের মধ্যে চারজনই ছিলেন সরকারের সাবেক আমলা।
বিশ্লেষকরা বলেন, সংস্থাটির এমন দুর্বল অবস্থা আওয়ামী লীগ সরকারের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব, আইনের দুর্বলতা ও আমলানির্ভরতার কারণেই হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, তিন বছর পরপর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, সার্বক্ষণিক সদস্য ও সদস্য নিযুক্ত করে সরকার। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন এ সংস্থার সব সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে মন্ত্রণালয়। ৪৬ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার প্রতিকার নিয়ে কাজ করে কমিশন। ২০০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালের জুলাইতে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ করে।
আওয়ামী লীগ হরহামেশাই মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছে। যদিও আইন করার পর থেকে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সব সময়ই। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত ৭ নভেম্বর মেয়াদ শেষের আগেই কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ ও অন্য সদস্যরা পদত্যাগ করেন। এরপর আর নতুন চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ হয়নি। সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন সংশোধনের লক্ষ্যে কমিশনের প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। গত ২০ নভেম্বর ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। এতে মানবাধিকার কমিশন নিয়ে আশার আলো দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল।
সমস্যা জর্জরিত কমিশনে ছিল না নজর : সম্প্রতি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কার্যালয়ে গিয়ে সংস্থাটির অন্তত পাঁচজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। তারা নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, কমিশনের নিজস্ব ভবন নেই, কর্মীদের সরকারিভাবে বেতন থাকলেও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। নেই আবাসন কিংবা যাতায়াত সুবিধা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সুপারিশ ছাড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা নেই। নেই দক্ষ আইনজীবী প্যানেল, কমিশনের নেই নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কমিশনের জরুরি কাজে যাতায়াতের জন্য আছে একটিমাত্র পুরনো মাইক্রোবাস। গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে এমন নানা সমস্যা নিয়েই চলেছে কমিশন। এসব সমস্যা সমাধানে আন্তরিক ছিল না তখনকার সরকার।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শাসনামলে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে যেমন একটি বলয়ে আটকে রাখা হয়েছিল, এই কমিশনকেও তেমনি নিজেদের বলয়ে আটকে রেখেছিল বছরের পর বছর।’
চলতে দেওয়া হয়নি নিজের মতো : কর্মকর্তারা বলেন, আওয়ামী লীগের সময় চেয়ারম্যান হিসেবে যারা নিয়োগ পেয়েছিলেন, কিছু ব্যতিক্রম বাদে তাদের কেউ বিগত সরকারের সময়ে নিজেদের স্বাধীন ভাবতে পারেননি।
নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনায় যখনই জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আন্তর্জাতিক মহল সোচ্চার হতো, ব্যাখ্যা চাইত তখন আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কমিশনকে এক ধরনের অলিখিত নির্দেশনা দেওয়া হতো। বলা হতো, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় এমন কিছু বলা বা প্রকাশ করা যাবে না। এমনকি আওয়ামী লীগের শেষ কয়েক বছরে কমিশনকে এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে কখনো কখনো চেয়ারম্যানকে ডেকে পাঠানো হতো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।
তবে, সদ্য পদত্যাগকারী কামাল উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা। সরকারের নির্দেশনায় নয়, আমরা আমাদের মতো করে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কমিশনের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় কারণ আইনটি যুগোপযোগী করা হয়নি। তবে, দুর্বলতার মধ্যেও এই কমিশন সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার নিয়ে কমিশন প্রতিনিয়ত উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিকারের সুপারিশ করেছে।’
জাতিসংঘের সম্মেলনে না যাওয়ার বিষয়ে কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সেখানে আমাদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ, ভূমিকা কোনোটিই ছিল না। আমরা বি ক্যাটাগরির বলে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। যে কারণে রাষ্ট্রের অর্থ অহেতুক ব্যয় করে সফর করতে চাইনি।’
ছয় চেয়ারম্যানের চারজনই আমলা : জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এখন পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে নিয়োগ পেয়েছেন ছয়জন (একজন ভারপ্রাপ্ত)। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ আমলের শেষ চারজনই ছিলেন সরকারের সচিব পদমর্যাদার ব্যক্তি। অধ্যাদেশ জারির পর ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আমীরুল কবীর চৌধুরী (বর্তমানে প্রয়াত)। তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন ২০১০ সালের ২১ জুন পর্যন্ত। এরপর ওই বছরের ২৩ জুন নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ২০১৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত। তার মেয়াদ শেষে একই বছরের ২ আগস্ট নিয়োগ পান সরকারের সাবেক সচিব কাজী রিয়াজুল হক। তিনি দায়িত্বে ছিলেন ২০১৯ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত। তারপর কিছুদিনের জন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলাম। তিনি ২০১৯ সালের ২ জুলাই থেকে একই বছরের ৬ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পান সরকারের সাবেক সচিব নাছিমা বেগম। তিনি ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার পর ওই বছর ১০ ডিসেম্বর নিয়োগ পান সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ।
মর্যাদা বাড়ানোর চেষ্টা হয়নি : প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ‘বি’ স্ট্যাটাস নিয়ে চলছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ও প্যারিস নীতিমালার শর্ত পূরণের ঘাটতির কারণে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নানা প্রশ্নের মুখে পড়ে এ সংস্থাটি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো চেষ্টাই হয়নি। বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কমিশন পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনসের (জিএএনএইচআরআই)’ তালিকায় বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ‘বি’ স্ট্যাটাসধারী। যদিও ভারত, জর্ডান, কাতারসহ আরও অন্যান্য দেশে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ‘এ’ স্ট্যাটাসধারী।
বিশ্লেষকদের মতে, স্ট্যাটাস না বাড়ার বড় কারণ সক্ষমতার ঘাটতি। এ ছাড়া আছে আইনের দুর্বলতা। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই কমিশনকে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেখিনি। আওয়ামী লীগ যেহেতু ক্ষমতায় ছিল, এর দায় তাদের ওপর বর্তায়। কিন্তু অন্যান্য রাজনৈতিক দলও এ বিষয়ে সোচ্চার হয়নি। ফলে অপরিহার্য এই কমিশনটি এখনো সেভাবেই রয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আইনের সংশোধনসহ প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার নিয়ে যারা ধারণা রাখেন, কাজ করেন তাদের দিয়ে এই কমিশন গঠন করা উচিত।’
কমিশন পুনর্গঠন এবং সার্বিক বিষয়ে জানতে আইন, বিচার উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও দুর্ভাগ্যজনক হলো কমিশন খুবই দুর্বল। আইনের দুর্বলতার পাশাপাশি বিগত সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতিও এর বড় কারণ।’
তিনি আরও বলেন, কামাল উদ্দিনের কমিশন কিছু দৃশ্যমান কাজ করলেও তাদের সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে, ড. মিজানের (অধ্যাপক মিজানুর রহমান) মতো আর কাউকে এত তৎপর দেখা যায়নি।
এই আইনজীবী মনে করেন, ‘কমিশনকে আমলানির্ভর করা যাবে না। কেন না সরকারি সুবিধাভুক্ত আমলারা কখনোই মানবাধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে পারেন না।’
