এজলাসে বিচারপতির দিকে ডিম ছুড়ে মারলেন আইনজীবীরা

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:১৭ পিএম

হাইকোর্টের একটি এজলাসে বিচারপতির উদ্দেশ্যে আইনজীবীদের ডিম ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার দুপুরে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চে (বিজয় ৭১ ভবনের ৩২ নম্বর আদালত) এ ঘটনা ঘটে।

৮ বছরের বেশি সময় আগে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ সংক্রান্ত ষোড়শ সংশোধনীর মামলার রায়ে তিন বিচারকের একজন ছিলেন বিচারপতি আশরাফুল কামাল। আর এ রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ নিয়ে কটু মন্তব্য করেছেন— এমন অভিযোগ করে কয়েকজন আইনজীবী প্রথমে তাকে উদ্দেশ্য করে কিছু মন্তব্য করেন।

এরপর একজন আইনজীবী তার দিকে ডিম ছুড়ে মারেন বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে ছুড়ে মারা ডিম বিচারপতির গায়ে লাগেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হৈ চৈ হট্টগোলের মধ্যে বিচারপতি আশরাফুল কামাল ও বেঞ্চের কনিষ্ট বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলাম এজলাস ত্যাগ করেন। এরপর বাকি সময় ওই বেঞ্চে আর বিচারকাজ হয়নি। এ আইনজীবীরা কারা ছিলেন বা তাদের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া গেলেও ষোড়শ সংশোধনীর মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।   

প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবীদের তথ্য মতে, মধ্যাহ্ন বিরতির পর দুপুর সোয়া ২টার দিকে এই বেঞ্চে বিচারকাজ শুরু হয়। আড়াইটার দিকে ১২ নম্বর আইটেমের বিচারকাজ চলাকালে কয়েকজন আইনজীবী ডায়াসের সামনে আসেন। একপর্যায়ে আইনজীবীরা জ্যেষ্ঠ বিচারক আশরাফুল কামালের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন,  ‘একজন বিচারপতি হয়ে আপনি স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। অনেক সহ্য করেছি। আপনি এখনও যদি এ চিন্তাভাবনা পোষণ করেন তাহলে আপনার বিচারক হিসেবে বিচারকাজ পরিচালনা করার অধিকার নেই। আপনার এই চেয়ারে বসা ঠিক হবে না। আপনি নেমে যান।’

একপর্যায়ে একজন আইনজীবী বিচারপতি আশরাফুল কামালকে উদ্দেশ্য করে একটি ডিম ছুড়ে মারেন। তবে তা এজলাসের ডেস্কে গিয়ে পড়ে। আকস্মিক এ ঘটনায় এজলাসে উপস্থিত আইনজীবী ও অন্যরা হতভম্ব হয়ে যান। দুই বিচারপতি তাৎক্ষণিক এজলাস থেকে নেমে যান।

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনে আওয়ামী লীগ সরকার। এর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত হয়। পরে এ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের তিন বিচারকের একটি বেঞ্চ ২০১৬ সালের ৫ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে রুল যথাযথ ঘোষণা করে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ও অবৈধ বলে রায় দেয়। 

আসাদুজ্জামান বনাম বাংলাদেশ শীর্ষক এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি আশরাফুল কামাল বাংলায় দেওয়া তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাকবাকুম করে ক্ষমতা নিয়ে নিলেন, তথা রাষ্ট্রপতির পদ দখল করলেন। একবারও ভাবলেন না, তিনি একজন সরকারি কর্মচারী। সরকারি কর্মচারী হয়ে কীভাবে তিনি আর্মি রুলস ভঙ্গ করেন। ভাবলেন না তার শপথের কথা। ভাবলেন না তিনি দেশকে রক্ষা করতে প্রয়োজনে মৃত্যুকে বরণ করার শপথ নিয়েছিলেন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানি ডাকাতরা সংঘবদ্ধভাবে ডাকাতি করে। ডাকাতদের যে নেতৃত্ব দেয় তাকে ডাকাত সর্দার বলে। ডাকাতি করার সময়ে ডাকাতরা বাড়িটি বা ঘরটি কিছু সময়ের জন্য অস্ত্রের মুখে দখল করে এবং মূল্যবান দ্রব্যাদি লুণ্ঠন করে। বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গংরা দেশে নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকা সত্ত্বেও অস্ত্র এবং অবৈধ কলমের খোচায় নির্বাচিত জাতীয় সংসদকে ভেঙে ডাকাতদের মতো অবৈধভাবে জোরপূর্বক জনগণের ক্ষমতা ডাকাতি করে দখল করেন।’

হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। একই বছরের ৩ জুলাই আপিলেও হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে। পরে আপিল বিভাগের এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন) আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। গত ২০ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ রিভিউ নিস্পত্তি করে রায় দিলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত