মোদি আদানির জুটি সেই গুজরাট থেকে

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:০২ এএম

এমন একদিনে করপোরেট কাহিনি লিখতে বসেছি, যেদিন ভারতের শিল্প জগতের এক কালো দিন। ১৯৮৪ সালের এই তারিখেই মধ্যপ্রদেশের এক সময়ের করদ রাজ্য ভূপালে বহুজাতিক শিল্প গোষ্ঠী ইউনিয়ন কার্বাইডের দুর্ঘটনায় এক রাতেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল বিস্তৃত জনবসতি। প্রাণ হারিয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। কত-শত মানুষ সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলেন, আজও তার সঠিক, যথাযথ কোনো তথ্য নেই। মনে আছে ঘটনার দীর্ঘ পঁচিশ বছর পরে অভিশপ্ত ভূপালে গিয়েও অসংখ্য জনতার হাহাকার-যন্ত্রণা শুনতে শুনতে বড় অসহায় লাগছিল। সারা ভূপাল জুড়ে দুর্ঘটনার প্রতিবাদে অজস্র মিটিং, জনসভা, পথনাটক হচ্ছিল। দাবি উঠেছিল অপরাধীর শাস্তি। সব হারানো মানুষের ঠিকঠাক ক্ষতিপূরণ। গভীর রাতে দীপ্ত মশাল মিছিলের আলোয় চোয়াল শক্ত নারী-পুরুষের মুখগুলো এখনো এত বছর পরেও চোখে ভাসে। ভূপালের ঘটনার সময় মধ্যপ্রদেশের ক্ষমতা ছিল কংগ্রেসের দখলে। শোনা যায় ইউনিয়ন কার্বাইডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিরাপদে জনতার রোষ থেকে বাঁচাতে প্লেনে তুলে দেওয়ার পেছনে তৎকালীন কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী দিগি¦জয় সিংহের হাত ছিল। এ নিয়ে পরে অনেক জল ঘোলা হয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দল, একাধিক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন তীব্র আক্রমণ শানিয়েছিলেন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তারপর তো নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসকে কোণঠাসা করে দেশের নীতিনির্ধারণকারী এখন নরেন্দ্র মোদির সরকার।

দেশের করপোরেট জগতের সঙ্গে মোদি সরকারের সুসম্পর্ক সর্বজনবিদিত। তার মধ্যে একটি শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে এই সরকারের দহরম মহরম নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেই আলোচিত। একাধিক বিরোধী দলের নেতা, বিশেষ করে পার্লামেন্টে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ও তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র প্রকাশ্যে সংসদেই নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে তোপ দেগে এমন অভিযোগ পর্যন্ত করেছেন যে, নরেন্দ্র মোদি বিদেশ সফরে ঘনঘন যান দেশের জন্য লগ্নি আনতে না, মূলত আদানি সাম্রাজ্যের দূত হয়ে তাদের জন্য দরবার করতে। বস্তুত গৌতম আদানি নিজেও বলেছিলেন যে, আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের বহু দেশে এবং বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরসঙ্গী ছিলেন তিনি। অনেকেই বলেন, অর্থনৈতিক বা দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আলোচনায় রাজনীতির প্রসঙ্গ না আনাই ভালো। এ-রকম বিশুদ্ধ অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আমি মোটেও একমত না। রাজনীতিকে বাদ দিয়ে অর্থনীতি, আবার তার উল্টোটা, অর্থনীতি ছাড়া রাজনৈতিক নীতি নির্ণয় সম্ভব নয়। আদানির উত্থানের পেছনেও তো স্পষ্ট রাজনীতির হাত রয়েছে। ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এ-রকম ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব বিরল ঘটনা। কিছুটা ধীরুভাই আম্বানির রিলায়েন্স গোষ্ঠীর কথা উঠতে পারে। কিন্তু আদানির শনৈঃশনৈ রকেট গতির কাছে আম্বানি বড়জোর ডাকোটা বিমান।

আপনি মার্কসীয় দ্বন্দ্ব তত্ত্ব নাও মানতে পারেন কিন্তু কোনো কিছুই যে আকস্মিক বা হঠাৎই ঘটছে না তা সামান্য যুক্তি-বুদ্ধি থাকলেই মেনে নেবেন। যেমন আদানির উত্থানের টাইমিং নিয়ে ঈষৎ চর্চা করলেই বুঝবেন কেন নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শিল্পপতি আদানির সম্পর্ক গভীর। দেশের যাবতীয় আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে কীভাবে গৌতম আদানি পৃথিবীর অন্যতম ধনকুবের হয়ে উঠলেন মাত্র দু দশকের মধ্যে, তা সত্যিই এক আধুনিক রূপকথা। ২০০২ সালে গুজরাট জেনোসাইডের সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি এতো সবাই জানেন। কিন্তু ওই জেনোসাইডের অভিঘাত এমন তীব্র ছিল যে দেশের অনেক বরেণ্য শিল্পগোষ্ঠীও ওই সময় গুজরাটের বিজেপি সরকারের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তখনো আদানি গোষ্ঠীর এমন রমরমা ছিল না। তবুও দুঃসময়ে নরেন্দ্র মোদির পাশে ছিলেন গৌতম আদানি। ডাক দিলেন ভাইব্র্যান্ট গুজরাটের। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আদানি গোষ্ঠীকে। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তো আদানি গোষ্ঠীর জয়রথ দুরন্ত গতিতে দেশের পর দেশে ছুটে চলেছে। আমেরিকা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ইসরায়েল, আফ্রিকার বহু দেশ, ইউরোপের নানান কান্ট্রি, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এমন অগণন দেশে আদানি সাম্রাজ্যের জয়যাত্রা অব্যাহত থেকেছে। কথায় বলে যো জিতা ওহি সিকান্দার, জয় জয়-ই, ছলে বলে কৌশলে যেভাবে হোক জিতলেই হলো। ফলে আদানির সাম্রাজ্যের বিশ্ব বিজয় কালো বা সাদা পথে হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন না তোলাই শ্রেয়। এয়ারপোর্ট, কয়লা, জাহাজ, বন্দর এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে আদানি গোষ্ঠীর পা পড়েনি। নরেন্দ্র মোদির হাত মাথায় না থাকলে রাতারাতি এই ঝাঁ চকচকে উত্থান সম্ভব ছিল না। আদানির রমরমা শুরু হয় জমি কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে। গুজরাটে শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য বিজেপি সরকার বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে স্বল্প দামে জমি দেওয়ার ঘোষণা করে। অগ্রণী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন দামে জমি পায়। মজা হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন রকমের মূল্য ধার্য করা হয়। কেউ স্কোয়ার মিটার জমির দাম দেন কয়েক হাজার টাকা। কেউ একটু কম। মোটের ওপর সবাই দাম দেন হাজার টাকা স্কোয়ার মিটার। সেখানে আদানির জন্য কোনো কোনো জমির মূল্য ধার্য করা হয় মাত্র এক টাকা স্কোয়ার মিটার। ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নেয় ছয়টি বিমানবন্দরকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হবে। চিরায়ত নীতি বদলে এও ঘোষণা করা হলো যে বিমানবন্দর পরিচালনার কোনো পূর্ব এবং বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা না থাকলেও সে আবেদন করতে পারে। বলাই বাহুল্য এর ফলে বিনা অভিজ্ঞতায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছয়-ছয়টি এয়ারপোর্ট হাতে পেয়ে গেল আদানি গোষ্ঠী। একটি ক্ষেত্রে তো বিমানবন্দরের মালিকানাধীন অন্য এক ব্যবসায়ী সংস্থাকে প্রায় ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। যাতে তারা কোনোভাবেই আদানির পথের কাঁটা না হতে পারে।

নরেন্দ্র মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়েই রাজ্যের বিপুল বনাঞ্চল যেভাবে আদানি গোষ্ঠী দখল করেছিল তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন সরকারি সংস্থা ক্যাগ পর্যন্ত। কিন্তু প্রভাবশালী হাত মাথায় থাকলে উপমহাদেশে সবই সম্ভব। বিদেশ থেকে কয়লা আনতে আমদানি শুল্ক অবধি কমিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আদানি স্বার্থে হয়েছে এদেশে। এই যে ভারত সরকার এখন মাওবাদী দমনের নামে দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, আকাশ থেকে বোমা ফেলে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হচ্ছে বিপুল সংখ্যক জঙ্গল। তার কারণ তো শিল্পপতিদের স্বার্থে। জল-জঙ্গল, পাহাড়ি এলাকা মূলত মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল। মাও সমর্থকদের বড় অংশ আদিবাসী জনজাতি। ফলে তথাকথিত উন্নয়নের নামে বনাঞ্চল থেকে আদিবাসী উচ্ছেদ করে সেই তল্লাটকে স্পেশাল ইকোনমিক জোন না করলে আদানি, আম্বানিদের মুনাফা বাড়বে কীভাবে!

অনেকেই বলেন, উন্নয়ন তো দেশের স্বার্থে একান্ত প্রয়োজন। শিল্প হলে বেকার যুবক কাজ পাবে। আদানি যে দেশে-বিদেশে বিরাট বিরাট শিল্প গড়ে তুললেন, তাতে অন্তত দেশের প্রচুর লোকজন ইতিমধ্যেই কাজ পেয়েছেন। কিন্তু, আপনি যদি এ-রকম ধারণা করে থাকেন তা পুরোপুরি ভুল। টাটা গোষ্ঠীর শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মীর সংখ্যা ৯ লাখের মতো। ইনফোসিস গ্রুপে লাখ দুইয়ের বেশি। এ দুটি তো বেসরকারি সংস্থা। সরকারি রেলওয়েতে তো শ্রমিক সংখ্যা ১২ লাখের ওপরে এমনকি আমূল দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ৩৬ হাজার কৃষকের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করে। সেখানে আদানি সাম্রাজ্যের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র ২৩ হাজার। ভারতে ট্যাক্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে পেছনের সারিতে আদানি গোষ্ঠী। লাভের অঙ্কের ওপর নির্ভর করে ট্যাক্সের অঙ্ক। এই ট্যাক্সের টাকায় দেশের উন্নয়ন এগোয় পেছোয়। কিন্তু ‘দেশপ্রেমিক’ আদানি গোষ্ঠী দেশের জন্য এমন নিবেদিতপ্রাণ যে সে নানাভাবে কর ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যায়। আমেরিকার সংস্থা আদানি শিল্পগোষ্ঠীর ওপর গুরুতর অভিযোগ এনেছে যে সে ঘুষ দিয়ে নিজেদের শেয়ারবাজারে প্রভাব বিস্তার করেছে। এ দন্ডনীয় অপরাধ। উইকিপিডিয়া অভিযোগ করেছে যে আদানি গোষ্ঠী নিজেদের পেজে কারচুপি করে বাজারকে ম্যানিপুলেট করে অন্যায় করেছে। এসব এখন তদন্তের বিষয়। কিন্তু দুনিয়ার শিল্প সাম্রাজ্যে এর ফলে ভারতের ভাবমূর্তি যে কলঙ্কিত হলো তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে যে টানাপড়েন, তার পেছনেও অন্যতম চরিত্র এই আদানি গোষ্ঠী। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় ছটি গ্রামের বিপুল জমি হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গেও নাম জড়িয়েছে আদানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের। বনাঞ্চল থেকে হটে যেতে হয়েছে আদিবাসীদের। ফলে সেখানে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। ঠিক যেমন বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা ও আরও বেশ কিছু দেশে। পুঁজি যেমন গ্লোবাল, ঠিক বিক্ষোভ, আন্দোলন ধীরে ধীরে বিশ্বজনীন হচ্ছে, এটা অনেকের চোখে পড়ে না। ইচ্ছা রয়েছে এ নিয়েও অবশ্যই বাংলাদেশের পুরনো সরকার ও আদানি-সখ্য নিয়ে ভবিষ্যতে বিস্তারিত লেখার।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত