এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘আমলারা এখন নানা পরিচয়ে মানুষের সামনে হাজির হন, যা দেশের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকে যে আমলা, কাল সেই রাজনীতিবিদ, পরের দিন সে ব্যবসায়ী। এটাই সমস্যা হয়ে গেছে। ওনারা বহুরূপে এখন আমাদের সামনে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে এই তিনটি একই হয়ে গেছে।’
গতকাল সোমবার এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘সুশাসনের জন্য জনকেন্দ্রিক সংস্কার : সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষা’ শীর্ষক নাগরিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
সম্মেলনে দেবপ্রিয় অংশগ্রহণকারীদের কাছে একটি প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ‘কে বেশি ক্ষমতাধর-আমলা, রাজনীতিবিদ নাকি ব্যবসায়ী।’ জবাবে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ‘আমলারা’। তিনি বলেন, ‘আমরা সারা বাংলাদেশ ঘুরে আলোচনা করেছি। সেসব আলোচনায় আমলাদের সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হিসেবে বলা হয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো অন্য জায়গায়। অনেক ক্ষেত্রে এই তিন পরিচয় একই ব্যক্তির হয়ে গেছে।’
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘যে বৈষম্যবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা আগের সরকারকে ফেলে দিলাম, সেই বৈষম্যবিরোধী চেতনার মূল মর্মবস্তুকে আমাদের ধারণ করতে হবে। আমরা লক্ষ করছি, বৈষম্যবিরোধী চেতনার পক্ষের শক্তির ভেতরে কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। এভাবে বৈষম্যবিরোধী চেতনার মূল তাৎপর্য তারা ক্ষুণœ করছে। যারা অনেক সময় বাহ্যত বৈষম্যবিরোধী কথা বলেই কিন্তু এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে আছে।’
সিপিডির এই সম্মানিত ফেলো রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের বিধান প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) ৮ ও ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বাংলাদেশ এবং সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) সহযোগিতায় সম্মেলনটি হয়েছে।
সম্মেলনে ড. দেবপ্রিয় স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশন হলে সাধারণ অজুহাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের সংস্কৃতি রোধ করা যায় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজেট বরাদ্দ দেওয়া যায়।’ তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর এ সরকারকে বসানো হয়েছে। এ সরকার বৈষম্যবিরোধী অবস্থান কেন নেবে না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার। আমাদের চাহিদার বৈচিত্র্য থাকবে, এটা স্বীকার করবে না, সেটা তো হতে পারে না।’
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দেশের নির্বাচনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনোনয়নবাণিজ্য। আমাদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো যখন দেব, সুপারিশগুলো দেব, তখন সরকার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছাবে। আমরা আশা করব, এ নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি হবে।’ তিনি বলেন, ‘সংসদে সংরক্ষিত আসন থাকতে হবে। তবে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ তরুণ ও ৩০ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিতে হবে।’
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেন, ‘তাদের মনোভাব-কেষ্ট বেটাই চোর। তারা বলেছেন, ওপর থেকেই সব সিদ্ধান্ত হয়েছে, পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছে আমাদের কী করার আছে? তার মানে ওনাদের কোনো দায়দায়িত্ব নেই।’ এসব কথা যদি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলেন, তাহলে কী হবে, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ও দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘গত সরকারের সময়ে কর্তৃত্ববাদ বিকাশের মূল কারণ ছিল দুর্নীতি। দুর্নীতি করতে হবে, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে হবে এবং সেগুলো করে বিচারহীনতা ভোগ করতে হবে, সেজন্য রাষ্ট্রকাঠামো দখল করতে হবে। দুদকসহ সব প্রতিষ্ঠান দখল করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যারা নিজেদের বিজয়ী ভাবছেন, তাদের কার্যকলাপ বৈষম্যবিরোধী চেতনার পরিপন্থী। আমরা সব কর্তৃত্ববাদ বর্জন করব, বলছি সবাই, কিন্তু কর্তৃত্ববাদের চর্চাটা বর্জন করছি না।’ এ সময় সংসদে তরুণ প্রতিনিধিত্ব ও একই পেশার ২৫ শতাংশের বেশি প্রতিনিধি না থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষা কমিশন হয়নি, যেটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল ক্ষেত্র ছিল। যারা জুলাই আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন, তাদের সরিয়ে দিয়ে কমিশন বাতিল করা হয়েছে।’
সিপিডির সম্মানিত ফেলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির আরেক সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, ইউএনডিপি বাংলাদেশের ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ সোনালি দয়ারতেœ প্রমুখ।
