দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ভবানীপুর রেলস্টেশন থেকে মধ্যপাড়া খনি পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার রেলপথ। মূলত খনি থেকে পাথর পরিবহনের জন্যই প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল। নির্মাণ শেষে ২০০৯ থেকে ওই রেলপথে পাথর পরিবহন শুরু হয়। অবশ্য নানা কারণে মাঝেমধ্যে ওই রেলপথে বন্ধ থেকেছে পাথর পরিবহন। তবে রেললাইন চুরি হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১৩ বছর ধরেই পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখনো চুরি হচ্ছে রেললাইনের অংশ।
এদিকে রেলপথটি সংস্কার না হওয়ায় মধ্যপাড়া পাথরখনি রেলপথে পাথর পরিবহনের কাজ পুরোপুরি বন্ধ আছে। ফলে সড়কপথে কয়েকগুণ বাড়তি খরচায় পাথর পরিবহন করতে হচ্ছে। যে কারণে দামও বাড়ছে পাথরের। অথচ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এই খনির ৮০ শতাংশ পাথর রেলপথে পরিবহন করার কথা। কিন্তু রেললাইন চুরি হওয়ায় সেটি আর হচ্ছে না।
রেলওয়ের পূর্ত বিভাগের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী (পার্বতীপুর) প্রকৌশলী মো. রাজা আলী শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, খনিমুখী ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথে স্লিপার, ফিটিংস, পাথর কিছুই নেই। ওই রেলপথে রেললাইনও চুরি গেছে। তাই পাথরের কংক্রিট, নতুন রেললাইন স্থাপন ও দুধারে মাটির কাজ করতে হবে। এ অবস্থায় ওই রেলপথে পাথর পরিবহন অসম্ভব।
তিনি জানান, বেশ কয়েক বছর আগে ওই রেলপথের বেশ কয়েকটি জায়গার ৭০টি স্লিপার চুরি যায়। এর পর থেকে বন্ধ হয়ে যায় পাথরবাহী ওয়াগনের চলাচল। অকেজো হয়ে পড়ে পাথর পরিমাপ স্কেল। পরে এ রেলপথে অবকাঠামো ও রেললাইন সংলগ্ন জমি স্থানীয় ভূমিদস্যুরা কব্জায় নিয়েছে। অনেকে লাইনের ওপরই বাড়িঘর নির্মাণ করেছে।
রেলপথটি সংস্কারে পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (সিএমই) মো. আসাদুর হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবানীপুর থেকে মধ্যপাড়া পাথরখনি পর্যন্ত রেলপথ সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী জানুয়ারি মাসে এই রেলপথের সংস্কারকাজ শুরু হবে। ইতিমধ্যে খনি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।
রেলপথ চালুর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. ফজলুর রহমান বলেন, রেলপথে পাথর পরিবহনে ভৈরব-ঢাকা পর্যন্ত প্রতি টনে খরচ হয় মাত্র ৩০০-৪০০ টাকা। অথচ সমপরিমাণ পাথর সড়কপথে পরিবহনে প্রতি টনে খরচ হয় ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে পাথরের দামও বেশি পড়ছে। তার ভাষ্য, পরিবহন সংকট, দাম বেড়ে যাওয়াসহ আরও কয়েকটি কারণে খনি থেকে উত্তোলিত পাথরের দুই-তৃতীয়াংশই অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে খনিটিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) শতাধিক বিদেশি খনি বিশেষজ্ঞ ও অর্ধশত দেশি প্রকৌশলী এবং প্রায় ১ হাজার দক্ষ খনি শ্রমিক কাজ করছেন। যারা প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করছেন। তবে ওই পাথরের বেশিরভাগই বিক্রি হচ্ছে না। এখনো খনির ১২টি ইয়ার্ডে ১১ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন পাথর অবিক্রীত পড়ে আছে।
খনি কর্র্তৃপক্ষ বলছে, এসব পাথর বিক্রি করতে না পারলে রাখার জায়গার অভাবে কিছুদিনের মধ্যে খনির উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খনিটি বন্ধ হয়ে গেলে হাজারের বেশি শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়বেন। বর্তমানে ধারদেনা করে ঠিকাদারের বিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত অক্টোবর মাসে খনিটি ৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা শোধ করেছে।
