সৌদি আরবকে ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে ফিফা। এর মাধ্যমে টানা দুই বিশ্বকাপের আয়োজক নির্ধারণ করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে সেই ঘোষণার পরই বিতর্কের মুখে পড়েছে সংস্থাটি। নিয়ম ভেঙে আয়োজক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের ফুটবল উন্নয়নের প্রশংসা করেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, যার দেশ পর্তুগাল ২০৩০ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হবে। পাশাপাশি, তিনি বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাবে খেলার কারণে এই দুই আয়োজকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগে রয়েছেন।
ফিফার নিয়ম ভাঙা প্রক্রিয়া ও সৌদি আরবের আয়োজক হওয়া : সৌদি আরবকে ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গতকাল ফিফার কংগ্রেসে এই ঘোষণা আসে। আয়োজক হওয়ার দৌড়ে একমাত্র প্রার্থী ছিল মরুর দেশটি। তবে আয়োজক নির্ধারণের এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সাধারণত ২১১ সদস্য দেশের গোপন ব্যালট ভোটের মাধ্যমে আয়োজক নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এবার ফিফা নিয়ম ভেঙে একসঙ্গে ২০৩০ এবং ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক ঘোষণা করেছে। ফিফার সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে ভোটের বদলে দুই আয়োজকের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। সমালোচকরা এই প্রক্রিয়াকে ‘আইন ভঙ্গ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
২০৩০ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো এবং দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা, চিলি ও প্যারাগুয়েকে। অন্যদিকে, ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে সৌদি আরব একমাত্র প্রার্থী হিসেবে অনুমোদন পায়।
নরওয়ে এই প্রক্রিয়ার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে কংগ্রেসে অংশ নেয়নি। ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সমালোচনার জবাবে বলেন, ‘আমাদের আয়োজকরা সমস্যা সমাধান করবে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।’
রোনালদোর উচ্ছ্বাস : পর্তুগিজ ফুটবল কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, যিনি বর্তমানে সৌদি আরবের লিগে খেলছেন, সৌদি আরবে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘এটি হবে ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ।’ তিনি সৌদি আরবের অবকাঠামো, স্টেডিয়াম এবং দর্শকদের জন্য থাকার ব্যবস্থার প্রশংসা করে বলেছেন, ‘সৌদির মতো আয়োজন করার সক্ষমতা খুব কম দেশেই আছে।’
রোনালদো আরও বলেন, ‘এটি একটি উজ্জ্বল দেশ এবং সৌদির ফুটবলের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল। এখানকার খেলোয়াড়রা দ্রুত উন্নতি করছে এবং বিশ্বকাপ আয়োজন এই উন্নয়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।’ সৌদি আরবের বিশ্বকাপ প্রস্তাবের সেøাগান ছিল ‘গ্রোয়িং টুগেদার’ যা ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেয়। সৌদি প্রেস এজেন্সি জানিয়েছে, এই প্রস্তাব ফিফার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪১৯.৮ পয়েন্ট অর্জন করেছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে অ্যামনেস্টি: সৌদি আরবের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার পর মানবাধিকার সংস্থাগুলো ফিফার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং আরও ২১টি সংস্থা যৌথ বিবৃতি দিয়ে এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লেবার রাইটস ও স্পোর্ট প্রধান স্টিভ ককবার্ন বলেন, ‘সৌদি আরবে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং শ্রমিক শোষণের ঝুঁকি রয়ে গেছে। শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি মৌলিক সংস্কার না আনা হয়, তবে শ্রমিকরা শোষণের শিকার হবেন এবং কেউ কেউ তাদের জীবন হারাবেন। ফিফা এই লঙ্ঘনের গুরুতর দায় বহন করতে পারে।’
অ্যামনেস্টি ফিফাকে মানবাধিকারের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনসহ কয়েকটি সংস্থা সৌদি আরবের বিডকে সমর্থন জানিয়েছে। তাদের মতে, সৌদি আরবের প্রস্তাব কারিগরি দিক থেকে শক্তিশালী এবং ফিফার মানদণ্ড পূরণ করেছে।
সৌদি আরব ইতিমধ্যেই ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। তবে ফিফার সিদ্ধান্তের নিয়ম লঙ্ঘন এবং মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিতর্ক এই আয়োজনের সাফল্যের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
