রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) শ্রেণিকক্ষ সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। প্রতি বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়ায় পাঠদানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় চালুর হয় মাত্র ৩০০ শিক্ষার্থী, ১২ শিক্ষক এবং ছয়টি বিভাগ নিয়ে। সেখানে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে আট হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। ছয়টি অনুষদ, একটি রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ ২২টি বিভাগ চালু রয়েছে। তবে বেশিরভাগ বিভাগেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই। ফলে অনেক সময় ক্লাস বাতিল করতে হয়।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে পাঁচ-ছয়টি করে ব্যাচ রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো বিভাগের ক্লাসরুমের সংখ্যা একটি, কোনো বিভাগের দুটি বা তিটি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ক্লাস রুম মাত্র একটি। বর্তমানে বিভাগটি চারটি ব্যাচের অন্তত ২৫০ শিক্ষার্থী আছেন। এ ছাড়া সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, লোক প্রশাসন বিভাগে পাঁচ-ছয়টি ব্যাচের শত শত শিক্ষার্থী
থাকলেও এসব বিভাগে শ্রেণিকক্ষ রয়েছে দুটি করে। জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগেরও শ্রেণিকক্ষ রয়েছে দুটি করে।
ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চারটি ব্যাচের একটি মাত্র ক্লাসরুম। ক্লাসরুম সংকটের কারণে মাঝে মাঝে গণিত বিভাগের একটি ক্লাসরুমে গিয়ে আমাদের ক্লাস করতে হচ্ছে। এটি কোনো সমাধান হতে পারে না। দিন যাচ্ছে শিক্ষার্থী বাড়ছে কিন্তু আমাদের ক্লাসরুম বাড়ছে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার কোনো পরিবেশ হতে পারে না। দ্রুত এর সমাধান করা উচিত।
শ্রেণিকক্ষ সংকট শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে উল্লেখ করে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একাধিক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত পরিবেশ না পেলে তাদের পড়াশোনার আগ্রহ কমে যায়। এতে তাদের মানসিক চাপ বাড়তে পারে, যা একাডেমিক ও ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিক্ষকরা বলছেন, এই সংকট শিক্ষাদানের মানেও প্রভাব ফেলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় আমাদের অনেক সময় পড়ানোর পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়। ফলে নির্ধারিত পাঠক্রম শেষ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সমস্যাটি সমাধানে সচেষ্ট হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. ইলিয়াস প্রামাণিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই সংকট এক দিনের না, বিভিন্ন সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা বললেও তা হয়ে উঠেনি। যেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বছরে বাজেট হয় হাজার কোটি, সেখানে এত বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট এসেছে মাত্র ২০০ কোটি ৫০ হাজার টাকা। আশা করি, খুব দ্রুত এই উপাচার্য সেসব সমস্যা সমাধান করবেন। আমরা বেশ কয়েকটি উদ্যোগ ইতিমধ্যে গ্রহণও করেছি। বিশেষ শিক্ষা সহকারীও আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন আমাদের প্রস্তাবনাগুলো পাস হবে, কোনো বৈষম্য থাকবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগেই জেনেছি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সংকটের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দেখলাম শ্রেণিকক্ষ সংকট চরমে। আমরা ১ হাজার ৮০ কোটি টাকার পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছি। এটি আলোর মুখ দেখলে আমাদের এসব সমস্যা থেকে দ্রুতই কাটিয়ে উঠব। সামনে আমরা একাডেমিক বিল্ডিংগুলো বহুতল করব, ফলে শ্রেণিকক্ষ সংকট থাকবে না বলে আশা করি।
