অজেয় বাঙালির দুর্জয় অগ্রযাত্রা

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৪৩ এএম

আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে পাকিস্তানি হানাদাররা এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের সহযোগিতায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা শুরু করে। ১৯৭১ সালে, বিজয়ের ঠিক ২ দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক এবং বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। সেটি ছিল, জাতিকে মেধাশূন্য করার জঘন্য নীলনকশা। কিন্তু হয়েছে কি? তারা ভুলে গিয়েছিল অথবা নির্বুদ্ধিতা, এই রকম নিষ্ঠুর পরিকল্পনার মাধ্যমে কোনোদিন স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করা যায়নি। হয়তো কিছু সময়ের জন্য মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছিলেন, কিন্তু তারপর?

পাকিস্তানি হানাদাররা ২৫ মার্চ রাতে যখন নিরস্ত্র মানুষদের ওপর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল, তখন তাদের প্রথম শিকার হয়েছিল বুদ্ধিজীবী সমাজ। আবার মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্তপর্বে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় যখন আসন্ন, তখনো তারা বুদ্ধিজীবী নিধনে মেতে ওঠে। অর্থাৎ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও সমাপ্তি হয়েছে বুদ্ধিজীবী হত্যার মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তানি হানাদাররা বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা তৈরি করতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গভবন থেকে পাকিস্তানি এই মেজর জেনারেলের স্বহস্তে লিখিত ডায়েরি পাওয়া যায়, যাতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া গেছে। মুক্তিযুদ্ধে ঠিক কতজন বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছিলেন, এত বছর পরও তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি সম্ভব না হলেও সরকারিভাবে বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ২২২ জনের একটি তালিকা অনুমোদন দিয়েছিল বিগত সরকার। এর পরের খবর জানা নেই।

১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়। মূলত ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। আর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয় ১৪ ডিসেম্বরে। পরিকল্পনার মূল অংশে দেশের শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, লেখক, গবেষকসহ চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তানি হানাদার এবং এদেশীয় দোসররা জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। সেদিন প্রায় ২০০ জনের মতো বুদ্ধিজীবীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চোখে কাপড় বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগসহ অন্যান্য আরও অনেক স্থানে থাকা টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে নৃশংসভাবে হত্যা করে রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে ফেলে রাখা হয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জেলাওয়ারী শহীদ শিক্ষাবিদ ও আইনজীবীদের একটি আনুমানিক তালিকা প্রকাশিত হয়। সেই তালিকায় ৯৬৮ জন শিক্ষাবিদ, ২১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নাম ছিল। এছাড়া বাংলাপিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী- শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ৯৯১ জন শিক্ষাবিদ, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবী ও ১৬ জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী এবং প্রকৌশলীর নাম ছিল। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, ফজলুর রহমান খান, হুমায়ূন কবীর, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. মোহাম্মদ মুর্তজা, ডা. শামসুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, ডা. মোহাম্মদ শফি, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, নিজামুদ্দিন আহমেদ, খন্দকার আবু তালেব, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, সৈয়দ নাজমুল হক, আলতাফ মাহমুদ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, রণদাপ্রসাদ সাহা, ড. আবদুল খায়ের, ড. সিরাজুল হক খান, ড. ফয়জুল মহী, ডা. আবদুল আলীম চৌধুরী, সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, অধ্যাপক হবিবুর রহমান, কবি মেহেরুন্নেসা, আইনজীবী নজমুল হক সরকার প্রমুখ। প্রশ্ন উঠতে পারে, পাকিস্তানি হানাদাররা সাধারণ জনগণের মধ্যে কেন বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল? শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিল্পী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, লেখক, গবেষকসহ এসব বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় নিয়োজিত মানুষকে কেন তারা হত্যার সিদ্ধান্ত করেছিল? এবং চূড়ান্ত পরাজয়ের মুহূর্তে কেন তারা নিজেদের সব জিঘাংসা চরিতার্থ করতে আবারও বেছে নিয়েছিল সেই বুদ্ধিজীবী সমাজকেই?

তারা অনুধাবন করতে পেরেছিল, একটা জাতি পূর্ণাঙ্গরূপে গড়ে ওঠে বুদ্ধিজীবীদের দেখানো পথ ধরেই। বুদ্ধিজীবী ছাড়া একটি জাতি সমৃদ্ধির পথে এগুতে পারে না। বুদ্ধিজীবীশূন্য মানে একটি দেশ ও জাতির অর্জন শূন্য। পাকিস্তানি হানাদাররা এটা বেশ ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিল। এই নিধনযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসকরা একদিকে জিঘাংসা চরিতার্থ করতে চেয়েছে, অন্যদিকে ভেবেছে বাঙালি জাতিকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে ফেললে তাদের জাতি গঠনের কাজ দুরূহ হবে। তখনকার সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে যখন একদলীয় বাকশালের শাসন কায়েম করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন এর বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম তো দূরে থাক, কোনো প্রতিবাদও উচ্চারিত হলো না। এর কারণ ছিল আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব, বুদ্ধিজীবীর অভাব। রাষ্ট্রের মধ্যে যখন অনিয়ম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন তার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ অনুভূত হয় বুদ্ধিজীবীর মনে। বুদ্ধিজীবীর কণ্ঠ তখন প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। কিন্তু বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীদের এমন দায়িত্বশীলতা লক্ষ করা যায় না। এখন বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন দলের লেজুড়বৃত্তিতে জড়িয়ে ভুলে গিয়েছেন বুদ্ধিজীবীর স্বরূপ এবং সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়িত্ব কী। আমরা যদি অতীতের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবও, স্বাধীনতা পূর্ববর্তী আমাদের বুদ্ধিজীবীরা সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল ও সোচ্চার ছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের বুদ্ধিজীবীদের এখন আবার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে শামিল হতে হবে। বুদ্ধিজীবী হিসেবে নিজের মধ্যে আত্মোপলব্ধির সঞ্চার ঘটাতে হবে। সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা, সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলা বুদ্ধিজীবীর নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সে দায়িত্বশীল বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা এখন কমে এসেছে। তবুও অনেক দেশপ্রেমিক মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবী প্রতিকূলতার মধ্যেও সে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে জাতির সূর্যসন্তানদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা’ জেগে উঠছে। চিন্তা, সুন্দর, কল্যাণ ও ভালোবাসা কখনো বিদায় বলে না। অজেয় বাঙালির দুর্জয় অগ্রযাত্রা রুখবে, এমন সাধ্য কার? 

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত