স্বাস্থ্য খাত

সংস্কার নিয়ে অসন্তুষ্ট অংশীজনরা

  • বদলি-পদায়ন, প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন, বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন- সংস্কারের অংশ, সংস্কার না
  • বিশেষজ্ঞদের মতামত বাদ দিয়েই স্বাস্থ্য আইনের খসড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে
  • সংস্কার কমিশন গঠন হয়েছে মাত্র
  • অংশীজনদের সঙ্গে বসছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও কমিশন
আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ১১:২৬ পিএম

সরকারের স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে অসন্তুষ্টি দেখা দিয়েছে। সংস্কারে গতি নেই। এখনো দৃশ্যমান নয় কোনো পদক্ষেপ। পরিকল্পনা প্রণয়নে স্বাস্থ্য খাতের অংশীজনদের সঙ্গে বসছেও না সরকার। এমনকি অংশীজনরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে নানা ধরনের পরামর্শ দিলেও, সেগুলোও বাস্তবায়ন হতে দেখা যাচ্ছে না। এতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিতে গিয়ে বারবার বিতর্কে পড়ছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর চার মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক রদবদল করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার চিকিৎসক কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যাদের আনা হয়েছে, তাদের নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। ব্যাপক হারে বদলি করতে গিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনেকগুলো সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করেছে।

সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তাদের পরিবারের সদস্য এবং দলীয় সংসদ সদস্যের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ কলেজে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতার অভিযোগে অনেক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কারবিষয়ক একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল করা হয়েছে। যদিও প্যানেল গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেন প্যানেল সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফায়েজ আহমেদ।

সর্বশেষ গত ১৮ নভেম্বর বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানকে প্রধান করে ১২ সদস্যের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন গঠন করে সরকার। কিন্তু সেই কমিশন গঠনের স্বচ্ছতা ও কাজের ধরন নিয়েও কথা বলতে শুরু করেছেন অংশীজনরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এসব কাজকে সংস্কার হিসেবে মানতে নারাজ স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা। তারা এটাকে সংস্কারের অংশ ও বাহ্যিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, গত চার মাসে সংস্কার কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে সরকার স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করল। বাকি যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলো সরকার পরিবর্তন-পরবর্তী সময়ের রুটিনওয়ার্ক।

বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব, জামায়াতে ইসলামীপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম-এনডিএফ, নাগরিক সংগঠন সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক, চিকিৎসক নেতা ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিমত পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত যা হয়েছে, সেগুলো সংস্কারের একটা বাহ্যিক অংশ। সংস্কার বলতে বোঝায় স্বাস্থ্য খাতে যে পদক্ষেপের ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে। সে ধরনের সংস্কার এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান না। এখন পর্যন্ত যা করেছে, সেগুলো আগের সরকারের সময় হওয়া অনিয়মের সংশোধন।

এনডিএওফ সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত অংশীজনদের সঙ্গে বসা। সেভাবে কিন্তু ওনারা এখনো বসতে পারেননি। ফলে তারা কী করছেন, সেটা এখনো দৃশ্যমান নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তনের জন্য কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে একটা প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর বাইরে যা করেছে, সেগুলো বিগত সরকারের দৃশ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান। সাধারণত সরকার পরিবর্তন হলে এটা হয়। সে অর্থে সংস্কারের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

এ ব্যাপারে সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশের আহ্বায়ক ডা. কাজী সাইফউদ্দীন বেন্নূর দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতটাই সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। 

সংস্কার প্রক্রিয়া সবে শুরু

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে সরকার সবেমাত্র স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে মনে করেন অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন করতে হলে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন সরকারের উচিত কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী সংস্কার করা।

অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, সংস্কার আরও ত্বরিত গতিতে হওয়া উচিত। এখন পর্যন্ত সংস্কারের গতি দৃশ্যমান না। রাজনৈতিক সরকার অনেক সময় দলীয় চাপের কারণে অনেক কিছু করতে পারে না। এ সরকারের সেই বাঁধা নেই। তারা ইচ্ছে করলেই অনেক অপ্রিয় পরিবর্তন করতে পারে। 

যা করা যেতে পারে

অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, যে জঞ্জাল ১৫ বছর ধরে তৈরি হয়েছে, সেটা রাতারাতি দূর হবে না। প্রশাসনের সব জায়গায় স্বাচিপ ছিল। আর বাইরে ছিল ড্যাব ও এনডিএফ। এই তিনটার বাইরে কোনো লোক নেই বললেই চলে। ফলে বদলি ও পদায়ন করতে গিয়ে আবার দলীয়করণ হয়েছে। এখন যেটা দরকার, সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোনো পেশায় সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় কেউ কোনো ধরনের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি করতে পারবেন না। কারণ এ ধারা অব্যাহত থাকলে এরপর যারা সরকার গঠন করবে, তখন স্বাস্থ্য খাতও তাদের দলীয় পেশার লোকজনের হয়ে যাবে।

বিভিন্ন মেডিকেল কলেজছাত্র রাজনীতি বন্ধের বিষয়ে এই শিক্ষক বলেন, এ উদ্যোগ ভালো। কিন্তু এই উদ্যোগ তো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা থাকবে না। এই উদ্যোগ ধরেই আইন পাস করতে হবে। কোনো পেশায় চাকরি বা ছাত্র থাকা অবস্থায় দলীয় রাজনীতি করতে পারবে না।

ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, ‘এখন ৩৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজ। এর মধ্যে ১৫টি হয়েছে গত সরকারের সময় দলীয় বিবেচনায়। অথচ সেসব কলেজের অবকাঠামো ও জনবল নেই। এখন এ সরকার চাইলে দুটি মেডিকেল কলেজকে একত্র করতে পারে। এতে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট কমে যাবে। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়েছে। এগুলো মানহীন, বন্ধ করে দিতে পারে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখনো টাকাপয়সার আখড়া। এখান থেকে আমরা কোনোভাবেই বের হতে পারছি না। এটা আপাদমস্তক বদলাতে হবে। শুধু একজন ডিজি বা দু-চারজন কর্মকর্তা বদলি করে কিছু হবে না। কারণ এটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি।’

অসন্তুষ্টির সঙ্গে আশাও আছে

সংস্কারের ব্যাপারে আশাও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, ‘এ সরকার একটা বড় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এসেছে। নিশ্চয় তারা মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেবে। এ ব্যাপারে আশাবাদী।’

এ  বিষয়ে ডা. কাজী সাইফউদ্দীন বেন্নূর বলেন, ‘বর্তমান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যারা নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা আগেরবারের মতো ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মে যাননি। এটা একটা ভালো দিক। বিএমডিসি, বিএসএমএমইউ উপাচার্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কিছু কিছু মূল জায়গায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভালো লোক দিয়েছেন। এটা একটা প্রশংসার ব্যাপার। আন্দোলনে যারা আহত হয়েছেন, তাদের জন্য কিছু শুরু হয়েছে দেরিতে হলেও। এটা আরও সুসংগঠিতভাবে করা উচিত।’

অংশীজনদের সঙ্গে বসছে না মন্ত্রণালয়, সংস্কার কমিশন

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন কী করছে তা অংশীজনরা জানেন না বলে অভিযোগ করেছেন ডা. হারুন আল রশীদ। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের অংশীজনদের সঙ্গে বসা দরকার। স্বাস্থ্য খাতে অংশীজনদের মধ্যে শুধু চিকিৎসকদেরই অন্তত ৫০টি শাখা আছে। এ ছাড়া নার্স, টেকনোলজিস্ট, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক মালিক, পরিবার পরিকল্পনাকর্মী, ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান— তারা কী ধরনের সংস্কার চান, জানা দরকার। কমিশন এখনো বসেনি।

এই চিকিৎসক নেতা বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে দিয়েছি। বলেছি যারা অংশীজন তাদের সঙ্গে বসুন। যেন দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। কিন্তু তারাও বসছে না।’

এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘সংস্কার দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। তবে শর্টটার্ম কিছু কাজ করা যেতে পারে। সেটা আমরা পরামর্শও দিয়েছি। আমরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে বসেছি, আমাদের কথাগুলো বলছি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের নিয়ে বসা— সেটা হয়নি।’ 

এ চিকিৎসক নেতা আরও বলেন, ‘সরকার উদ্যোগী হয়ে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন করেছেন। কমিশন কী করছে, সেটা এখনো দৃশ্যমান নয়। তাই জানি না তারা সংস্কারের জন্য কী করছেন।’ 

আইনের খসড়া নিয়েও প্রশ্ন

অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের খসড়ায় এমন অনেক ধারা আছে, সেটা স্বাস্থ্য খাতকে আরও বেশি অরক্ষিত করে দেবে। এ ব্যাপারে আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণ দিয়েছি। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব পর্যবেক্ষণ সংযুক্ত না করেই পুরনো খসড়া ওয়েবসাইটে দিয়েছে। তাতে তো উদ্দেশ্য সৎ মনে হচ্ছে না।’ 

এ ব্যাপারে অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইনের আইনে বেশ কিছু দুর্বোধ্য, অস্বচ্ছ ও অসম্পূর্ণতা ছিল। সেটা আমরা রিভিউ করে কমেন্টসগুলো উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন মহলে পাঠিয়েছিলাম। তারা সেটার ভিত্তিতে কিছু রিভিশন করেছে। কিন্তু এখনো মনে করি আইনটা আরও ভালোভাবে দেখা দরকার। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যে ধরনের সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো দরকার ছিল, সেগুলো কম আছে।’

তবে কমিশনের সুপারিশের আগে স্বাস্থ্য আইন চূড়ান্ত করা ঠিক হবে বলে মনে করেন এই শিক্ষক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কিছু করতে গেলে লিগ্যাল ডকুমেন্ট লাগবে। সে কারণে যে আইন খসড়া আকারে আছে, সেটা কমিশনের রিপোর্ট হওয়ার পর সে অনুপাতে সেই আইন চূড়ান্ত করে পাস করা উচিত। তা না হলে কমিশনের সুপারিশগুলো তো আর আইনি কাঠামোর ভেতর গেল না। আইনি কাঠামোর মধ্যে না গেলে কমিশনের সুপারিশগুলো শুধু ডকুমেন্ট হিসেবেই থেকে যাবে। সেটা বাস্তবায়ন হবে না। সেজন্য কমিশনের সুপারিশমালার ভিত্তিতে আইনের সংশোধন হওয়া উচিত।’ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত