শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা। প্রতিদিন জেলার প্রধান প্রধান সড়ক এবং পাড়া-মহল্লায় ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন মানুষ। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, সবজি বিক্রেতা, শ্রমিকসহ কেউ রেহাই পাচ্ছেন না ছিনতাইকারীদের কবল থেকে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সুযোগ বুঝে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী। ছিনতাইকারীদের বাধা দিতে গেলেই ঘটছে জখম ও প্রাণহানির ঘটনা। গত এক মাসে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন শিক্ষার্থীসহ তিনজন। এ ছাড়া কয়েক মাসের ব্যবধানে ঘটেছে বেশ কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা। এতে করে জনমনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এ ছাড়া রয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়ক, নারায়ণগঞ্জ-আদমজী সড়ক, নাগিনা জোহা সড়ক, ৩০০ ফিট হাইওয়ে, এশিয়ান হাইওয়েসহ অনেক আঞ্চলিক সড়ক। রাত যতই গভীর হতে থাকে এসব সড়কে ছিনতাইকারীদের আনাগোনা ততই বেড়ে যায়। নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন স্থানেও বেড়েছে ছিনতাই।
সর্বশেষ গত ১২ ডিসেম্বর ভোরে বিশ^বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে শিক্ষার্থী সীমান্তকে (২০) শহরের দেওভোগে মর্গ্যান গার্লস স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীরা ছুরিকাঘাত করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ ডিসেম্বর সীমান্ত মারা যান। তিনি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় এআইইউবির শিক্ষার্থী ছিলেন। নিহত সীমান্ত শহরের দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকার আলমের ছেলে। গতকাল বুধবার দুপুরে পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, সীমান্তকে হত্যার ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে দেওভোগ এলাকা থেকে অনিক নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনিকের কাছ থেকে সীমান্তের মোবাইল ফোন এবং তাকে হত্যায় ব্যবহৃত চাকু উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে গত ২৪ নভেম্বর রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের আগলা এলাকায় ছিনতাইকারীরা চালক বাবুল মিয়াকে (৫২) হত্যা করে অটেরিকশা নিয়ে যায়। ২১ নভেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় শাকিল মিয়া (২৬) নামে এক চালককে গলা কেটে হত্যার পর অটোরিকশা নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।
গত ৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া এলাকায় ছিনতাইকারীরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কদের বহনকারী মাইক্রোবাস আটকে তাদের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগসহ জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। তাদের হামলায় কয়েকজন সমন্বয়ক আহত হন।
১ ডিসেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের কিল্লারপুর এলাকার ডিপিডিসি নারায়ণগঞ্জ (পূর্ব) শাখা অফিসে নিরাপত্তাকর্মীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। গত ২৭ নভেম্বর ভোরে সদর উপজেলার সস্তাপুর এলাকায় ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের বাড়িতে ডাকাতরা হানা দিয়ে ৪০ ভরি স্বর্ণালংকার, ৭ লাখ টাকা লুটে নেয়। গত ১০ নভেম্বর ভোরে নাগিনা জোহা সড়কের চাঁদমারী এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা তিন ছিনতাইকারী অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে লুটে নেয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী নাবিলা রশিদের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও ৩২ হাজার টাকা। এর কয়েকদিন আগে চাঁদমারীতে অটোরিকশায় আসা চার ছিনতাইকারী এক পথচারীর সর্বস্ব কেড়ে নেয়।
নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে শহরের নিতাইগঞ্জে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন হোসিয়ারি শ্রমিক নাসিমা আক্তার। ৪ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের উচিৎপুরা-জাঙালিয়া সড়কের শিবপুর ব্রিজ এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে বিল্লাল হোসেন নামে এক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মালিককে প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে। গত ২৫ অক্টোবর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ উপজেলার চেঙ্গাকান্দি এলাকা থেকে চালক হানিফকে হত্যা করে একটি প্রাইভেটকার ছিনতাই করে ছিনতাইকারীরা।
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি ফারহানা মানিক মুনা বলেন, ‘সকাল-রাতে ছিনতাইয়ের শিকার হতে হচ্ছে নারায়ণগঞ্জবাসীকে। আমরা নাগরিক নিরাপত্তা চাই, স্বস্তিতে-নির্ভয়ে নিজ জেলায় বসবাস করতে চাই। ছিনতাইকারীদের উপদ্রব রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে।’
বাংলাদেশ হোসিয়ারি সমিতির সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান বদু বলেন, ‘শ্রমিকরা বেতন নিয়ে রাতে বাড়ি ফেরার পথে তাদের টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা। আমরা বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছি এবং ব্যবসায়ীরাও সংগঠিত হয়েছি। চেষ্টা করছি এগুলো কমিয়ে আনতে।’
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে ছিনতাই আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। তবে অনেক ছিনতাইকারী ও ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন অভিযানে তৎপর রয়েছে। আশা করছি, আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা অনেক কমে আসবে।’
