বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) ও আপিলের ওপর রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। এতে অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনার মামলায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মৃত্যুদন্ড থেকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ছয়জন খালাস পেয়েছেন। এছাড়া মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত অপর ৬ আসামির সাজা কমিয়ে ১০ বছর করে কারাদন্ড দিয়েছে হাইকোর্ট। অন্যদিকে একই মামলায় বিচারিক আদালতে সর্বোচ্চ দন্ডপ্রাপ্ত ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়ার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, গতকাল বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলার রায় ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। একই আদালতে ওই ঘটনায় অস্ত্র আইনের মামলায় বিচারকাজ চলমান রয়েছে। এ মামলায় বিচারিক আদালতে লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দিয়েছিল বিচারিক আদালত।
গত ৩০ নভেম্বর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় খালাস পান লুৎফুজ্জামান বাবর। ১০ ট্রাক অস্ত্র আইনের মামলায় মৃত্যুদন্ড থেকে খালাস পেলেও একই ঘটনায় অস্ত্র আইনের মামলায় তার যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ থাকায় তিনি এখনই মুুক্তি পাচ্ছেন না বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় ২০২১ সালের ১২ অক্টোবর লুৎফুজ্জামান বাবরকে আট বছর কারাদন্ডাদেশ দিয়েছিল ঢাকার একটি আদালত। আপিলের পর গত ২৩ অক্টোবর হাইকোর্ট তাকে সাজা থেকে খালাস দেয়।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) ঘাট থেকে ১০ ট্রাক অস্ত্র চালানের ঘটনায় চোরাচালান ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা হয়। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার রায়ে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আমির মতিউর রহমান নিজামী (যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদন্ড কার্যকর), লুৎফুজ্জামান বাবর, পরেশ বড়ুয়া, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রহিমসহ (ইতিমধ্যে মারা গেছেন) ১৪ জনকে মৃত্যুদন্ড দেয়। এছাড়া অস্ত্র আইনের মামলায় ১৪ আসামিকে যাবজ্জীন কারাদন্ড দেয় আদালত। এরপর মৃত্যুদন্ড ও যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে। সাজাপ্রাপ্ত ১২ আসামি পৃথক আপিল করেন। গত ৬ নভেম্বর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়। হাইকোর্ট আসামিদের ডেথ রেফারেন্স নাকচ ও আপিল আংশিক মঞ্জুর করে রায় দেয়।
রায়ে আদালত বলেছেন, লুৎফুজ্জামান বাবর, সিইউএফএলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মহসিন উদ্দিন তালুকদার, তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কে এম এনামুল হক ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এ কারণে তারা অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার অধিকারী। এ মামলায় বিচারিক আদালত মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদন্ড ও অর্থদন্ড দিয়েছিল। হাইকোর্টের রায়ে তার বিষয়ে বলা হয়েছে, মারা যাওয়ায় তার আপিল মেরিটে নিষ্পত্তি করে অব্যাহতি দেওয়া হলো। মামলাটিতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব নুরুল আমিনকে (পলাতক) খালাস দিয়েছে হাইকোর্ট।
এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে উলফার পরেশ বড়ুয়াকে মৃত্যুদন্ড ও অর্থদন্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। মামলার শুরু থেকেই এ আসামি পলাতক। তার বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। পারিপার্শ্বিকতা ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিবেচনায় তার সাজা পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় হাইকোর্ট।
বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৬ আসামির সাজা কমিয়ে ১০ বছর করে কারাদ- দিয়েছে হাইকোর্ট। আসামিরা হলেন, এনএসআইয়ের তৎকালীন মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খান, এনএসআইয়ের সাবেক উপপরিচালক মেজর (অব.) লিয়াকত হোসেন, তৎকালীন পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাব উদ্দিন আহাম্মদ, চোরাকারবারি হাফিজুর রহমান, ঘটনায় শ্রমিক সরবরাহকারী দ্বীন মোহাম্মদ ও ট্রলার মালিক হাজি সোবহান। বিচারিক আদালতের রায়ে এ আসামিদের ৫ লাখ টাকা করে অর্থ দেওয়া হলেও হাইকোর্টের রায়ে তাদের ১০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ড দেওয়া হয়েছে।
একই মামলায় এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রহিমের মৃত্যুদন্ড ও অর্থদন্ডের সাজা হয়। তার বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, মারা যাওয়ার কারণে তার আপিল অ্যাবেট (পরিসমাপ্তি) ঘোষণা করা হলো। বিচারিক আদালতের দেওয়া অর্থদন্ডের আদেশ সংশোধন করে তাকে ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড আরোপ করে হাইকোর্ট।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান। আরও ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, মোহাম্মদ আহসান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতানা আক্তার রুবী ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসিফ ইমরান জিসান। পলাতক আসামির পক্ষে শুনানিতে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাসনা বেগম, সাধন কুমার বণিক মো. মহিউদ্দিন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সুলতানা আক্তার রুবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অস্ত্র চোরাচালানের মামলায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ (বি) ও (ডি) ধারায় বিচারিক আদালতে তাদের মৃত্যুদন্ড হয়েছিল। আজ ডেথ রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তি করে এ রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। একই আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের মামলায় বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। এ মামলায় আসামিদের আপিল এই আদালতে বিচারাধীন আছে। আশা করি দ্রুত এ বিষয়ে শুনানি শুরু হবে।’ চোরাচালানের মামলায় খালাসপ্রাপ্ত ও সাজা কমে যাওয়ার বিষয়ে আপিল বিভাগে আপিল করা হবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।
