হাসিনাসহ ৫৮ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:২৯ এএম

১৫ বছরের বেশি সময় আগে রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর (এখন বিজিবি) সদর দপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহ ও ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ৫৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পিলখানায় নিহতদের কয়েকজন স্বজন গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে এসে এই অভিযোগ করেন। এ সময় তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদ, কর্নেল মুজিবুর হকের স্ত্রী মেহরিন ফেরদৌসী, কর্নেল কুদরত এলাহীর ছেলে সাকিব রহমানসহ অন্তত ২০ জনের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকা- নিয়ে একটি অভিযোগ আমরা পেয়েছি। অভিযোগটি যাচাই করে দেখব এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের মধ্যে পড়ে কি না। এরপর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযোগকারীরা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ রাইফেলস বিডিআর ধ্বংসের নীলনকশা প্রণয়ন করে। সেই লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম শিকারে পরিণত হয় বাংলাদেশ রাইফেলসে তৎকালীন কর্মরত পেশাদার, সৎ-দক্ষ, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর অফিসারদের একটি অংশ। শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর সেসব দেশপ্রেমিক সেনা অফিসারদের নিজের স্বৈরশাসন পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে প্রথম ও প্রধানতম অন্তরায়-বিপত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে ওই সেনা অফিসারদের এবং তাদের পরিবারের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সংঘটন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করার মাধ্যমে নিজের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।’

এতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা ও তারিক আহমেদ সিদ্দিকির নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় অন্যান্য আসামি আওয়ামী ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শেখ হাসিনার পরিকল্পনাধীন স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সহজ ও চিরস্থায়ী করতে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা থেকে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত পিলখানা সদর দপ্তরে তৎকালীন বিডিআরে কর্মরত নিরস্ত্র সেনা কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে পদ্ধতিগত উপায়ে নারকীয় হত্যাকা- চালায়। অভিযোগকারীরা পিলখানা গণহত্যার তদন্ত ও বিচার সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ওই সময় পিলখানায় বিদ্রোহী জওয়ানদের হামলায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। পিলখানা হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিচারিক আদালতের রায়ে ১৫২ জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ১৬০ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদ-। ২৫৬ আসামিকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান ২৭৮ জন। এরপর ফাঁসির আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদ- অনুমোদন), আপিল, জেল আপিল, অপর্যাপ্ত সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল নিষ্পত্তি করে ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি দুদিন রায় দেয় হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ। এতে বিচারিক আদালতে ফাঁসির সাজা পাওয়া ১৩৯ আসামির দ- বহাল রাখা হয়। এ ছাড়া আটজনকে মৃত্যুদ- থেকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত পাঁচজনকে খালাসের রায় দেওয়া হয়। আর বিচারিক আদালতে ১৬০ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে হাইকোর্টে ১৪৬ জনের যাবজ্জীবন সাজা বহাল থাকে। এ সাজা থেকে খালাস দেওয়া হয় ১৪ জনকে। এ ছাড়া বিচারিক আদালতে ৬৯ জনের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করে ৩১ জনকে যাবজ্জীন সাজা দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টে মোট ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন সাজার রায় হয়। হাইকোর্টের রায়ের পর মামলাটি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। একই ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলায় তদন্ত শেষে ২০১০ সালের ২৭ জুন অভিযোগ গঠন করে ঢাকার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ১ হাজার ৩৫৭ জনকে। ইতিমধ্যে আড়াইশর বেশি সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। মামলাটির বিচারকাজ চলছে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার এক নম্বর মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনালের অস্থায়ী আদালতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত