নবুওয়াতের একেবারে গোড়ার দিকের কথা। হেরা গুহায় হজরত জিবরাইল (আ.) রাসুল (সা.)-এর কাছে অহি নিয়ে এসেছেন কয়েক মাস আগে। প্রথম দিকে অবশ্য একটু বিরতি দিয়েই অহি নাজিল হতো। এ বিরতি রাসুল (সা.)-এর জন্য ছিল আশঙ্কা আর পেরেশানির। আশঙ্কা হলো নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব পালনের কোনো রোডম্যাপ এখনো তৈরি হয়নি। অন্যদিকে মানুষকে কীভাবে আল্লাহমুখী করা যায়, পথ দেখানো যায়, এ চিন্তায় তিনি ছিলেন পেরেশান। এমন সময় ঘটল আরেক বিপত্তি। কুরাইশ নেতারা দারুণ নদওয়ায় পরামর্শ সভা ডেকে নবীজিকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন কটু কথা বলে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করা হয়। সেসব প্রস্তাব আবার প্রত্যাখ্যানও হয়। হওয়ারই কথা। রাসুল (সা.) তো বাইরে থেকে আসা কোনো মানুষ নন। তিনি কুরাইশদেরই সন্তান। তার অনুপম চারিত্রিক মাধুর্যের সাক্ষ্য এতকাল তারাই দিয়েছে।
সেদিনের মতো সভা শেষ হয়েছে। কিন্তু সে সভার কার্যবিবরণী কীভাবে যেন নবীজি জেনে ফেলেন। কদিন হলো দাওয়াতি মিশন শুরু হয়েছে। যে কুরাইশদের সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে, তারাই থামিয়ে দিতে চাইছে! মনে মনে নবীজি কিছুটা দমে গেলেন। দূরের মানুষ বিরোধিতা করলে কাছের মানুষজনকে সঙ্গে নিয়ে মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু কাছের মানুষ যদি বিরোধিতা করে তখন কোথাও আর যাওয়ার থাকে না। রাসুল (সা.) মন খারাপ করে চাদর মুড়ি দিয়ে জড়সড় হয়ে শুয়ে রইলেন।
রাসুল (সা.)-এর মন খারাপ হয়েছে কাছের মানুষরা তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে বলে। আসলে আল্লাহর নিয়ম অন্যরকম। কাছের মানুষ যাকে দূরে ঠেলে দেয় আল্লাহ তাকে কাছে টেনে নেন। আল্লাহ নবীজিকে পরম মমতায় ডাক দিলেন, ‘ইয়া আইয়্যুহাল মুজ্জাম্মিল! কুমিল্লায়লা ইল্লা কালিলা।’ আরবি ভাষা তত্ত্ববিদরা বলেন, ‘মুজ্জাম্মিল’ শব্দটি এসেছে ‘তাজাম্মুল’ থেকে। এর অর্থ চাদর বা কোনো কাপড় মুড়িয়ে শুয়ে থাকা ব্যক্তি। ‘ম্জ্জুাম্মিল’ শব্দটি নবীজির ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে এর অর্থ হবে, হে চাদরাবৃত নবী! রাতের আঁধার ভেদ করে ভোরের সূর্য আনার দায়িত্ব তোমার কাঁধে। মন খারাপ কিংবা ভয় পাওয়া তোমার চলবে না। ‘কুমিল্লায়লা ইল্লা কালিলা’-এর সহজ অনুবাদ হলো, রাতের কিছু অংশ দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ পড়। তবে ভাবার্থ আরও মজার। ‘কুম’ মানে দাঁড়াও, জেগে ওঠো। বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হও। ‘লায়ল’ মানে রাত, অন্ধকার, বিপদ, জুলুম। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা নবীজিকে বলছেন, ‘হে মুহাম্মাদ (সা.)! তোমার এখন চাদর জড়িয়ে আরামে ঘুমানোর সময় নয়। তোমার সামনে মহান দায়িত্ব। বিশ্বমানবতার বোঝা তোমার কাঁধে। ভয় পেও না। সাহস করে দাঁড়াও। দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই নবীজি দেখলেন চারদিকে ঘোর অন্ধকার। এ অন্ধকারের বুক চিরেই তাকে আলোর সূর্য আনতে হবে। সামনের দিনগুলো তার জন্য আরও কঠিন। তাই আল্লাহ তাকে বললেন, ‘কুমিল্লায়লা ইল্লা কালিলা’ তথা এখন থেকে নিজেকে রাঙিয়ে নাও তাহাজ্জুদের রঙে। (তাফসিরে মাজহারি ১০/১০২)
আজকের দুনিয়ায় যারা নবুওয়াতি মিশনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন, তাদের জন্য ‘ইয়া আইয়্যুহাল মুজ্জাম্মিল। কুমিল্লায়লা ইল্লা কালিলা’ এ দুটি আয়াতে রয়েছে অনেক বড় শিক্ষা। নবুওয়াতি মিশনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আরামের চাদরে ঘুমিয়ে থাকার সুযোগ নেই। যাদের কাঁধে দাওয়াতি মিশনের দায়িত্ব, তাদের সামনে অবশ্যই অনেক কালো রাত আসবে। বিপদের পাহাড় আসবে। লোভের হাতছানি আসবে। একজন দায়িত্বশীল দাই বিপদে যেমন ভয় পাবে না তেমনি লোভের ফাঁদেও পা দেবে না। ইসলামবিরোধী শক্তি যুগে যুগে দ্বীনের দাইদের লোভের প্রলোভন দিয়ে বিপথগামী করতে চেয়েছিল। নবীজিকেও ধনসম্পদ-ক্ষমতা আর নারীর লোভ দেখিয়ে বলা হয়েছিল, ‘হে মুহাম্মদ! সত্যের দাওয়াত থেকে সরে আসো। তুমি যা চাইবে তাই পাবে।’ জবাবে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ার সম্পদ তো দূরে থাক, তোমরা যদি চাঁদ আর সূর্যও আমাকে এনে দাও, নবুওয়াতি মিশন থেকে আমি এক পাও সরে দাঁড়াবো না।’ হে আল্লাহ! দ্বীনের রাহবারদের ইমানি শক্তি আপনি বাড়িয়ে দিন। আমিন।
