২০২৪ সাল বিশ্ব টেনিসের জন্য ছিল এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। কোর্টে তারকাদের তুমুল লড়াই, তরুণ প্রতিভাদের উত্থান এবং নতুন রেকর্ডের ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে ভরপুর ছিল বছরটি। গ্র্যান্ড সø্যাম থেকে শুরু করে ডেভিস কাপ এবং অলিম্পিক টেনিসপ্রেমীরা উপভোগ করেছেন নানা ধরনের নাটকীয়তা। বছরটি সবচেয়ে স্মৃতিময় কেটেছে দুই তারকা ইয়ানিক সিনার ও আরিনা সাবালেঙ্কার। এ দুজন বছরটিতে শুধু রাজত্ব করেই থামেননি। দেখিয়েছেন দৃপ্ত প্রতিজ্ঞা, নৈপুণ্যের ধারাবাহিকতা। রেখেছেন প্রতিভার অসাধারণ ছাপ।
দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের পাশাপাশি এটিপি ফাইনালসহ আরও পাঁচটি শিরোপা নিজের নামের পাশে লিখিয়েছেন সিনার। বছরের মাঝামাঝি জুন নাগাদ র্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানে ওঠার পর সেটি আর নড়চড় হতে দেননি তিনি। দুইয়ে থাকা আলেক্সান্ডার ভেরেভের চেয়ে চার হাজার পয়েন্টে এগিয়ে থেকে বছর শেষ করেন সিনার। নারীদের ভেতর প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুমুলে থাকলেও বছর সেরার শেষ হাসি হেসেছেন সাবালেঙ্কা। র্যাংকিংয়ের দুইয়ে থেকে বছর শুরু করা সাবালেঙ্কা জিতেছেন ডব্লিউটিএর বছরসেরা টেনিস তারকার স্বীকৃতি।
অস্ট্রেলিয়ান ওপেন : বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারিতে। পুরুষ সিঙ্গেলসে দানিল মেদভেদেভকে হারিয়ে ইয়ানিক সিনার জিতে নেন বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা। নারীদের বিভাগে আরিনা সাবালেঙ্কা তার শিরোপা ধরে রাখেন। ২০২৩ সালের মতো এ বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যামও নিজের করে নেওয়ার পথে তিনি হারান ঝেঙ্গকিনওয়েনকে।
ফ্রেঞ্চ ওপেন : ক্লে কোর্টের রাজা রাফায়েল নাদাল চোটের কারণে ফ্রেঞ্চ ওপেন থেকে ছিটকে গেলেও আসর ছিল সমান উত্তেজনাপূর্ণ। নাদালের উত্তরসূরি কার্লোস আলকারাজ তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে টুর্নামেন্ট জয় করেন। ফাইনালে তিনি হারান আলেক্সান্ডার ভেরেভকে। নারীদের বিভাগে ইগা সোয়ানতেক তার ক্লে কোর্টের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে জেসমিন পাওলিনিকে হারিয়ে টানা তৃতীয়বার ফ্রেঞ্চ ওপেনের শিরোপা জেতেন।
উইম্বলডন : গ্রাস কোর্টের এই ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্টে নোভাক জকোভিচ এবং কার্লোস আলকারাজের মহারণ ছিল বছরের অন্যতম হাইলাইটস। টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে আলকারাজ জকোভিচকে হারিয়ে উইম্বলডনের শিরোপা নিজের করে নেন। অন্যদিকে ফ্রেঞ্চ ওপেনের মতো উইম্বলডনেও তীরে এসে তরী ডোবে জেসমিন পাওলিনির। তাকে হারিয়ে ২০২১ ফ্রেঞ্চ ওপেনের পর প্রথম কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা জেতেন বারবোরা ক্রেচিকোভা।
ইউএস ওপেন : নিউ ইয়র্কের ফ্লাশিং মিডোসের এবারের আসরেও ছিল জমজমাট উত্তেজনা। নারীদের বিভাগে আরিনা সাবালেঙ্কা শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে হারান জেসিকা পেগুলাকে। আর ঘরের মাঠে মার্কিন তারকা টেইলর ফ্রিটজের স্বপ্নভঙ্গ করে ইয়ানিক সিনার জিতে নেন বছরের শেষ গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা।
অলিম্পিকে টেনিস রোমাঞ্চ : ২০২৪ সালে গ্র্যান্ড সø্যাম ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলেও প্যারিস অলিম্পিকে স্বর্ণ জিতে ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটনার টেনিস কিংবদন্তি নোভাক জকোভিচ। দুর্দান্ত রোমাঞ্চকর ফাইনালে কার্লোস আলকারাজকে ৭-৬, ৭-৬ ব্যবধানে হারান রেকর্ড ২৪টি গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী জকোভিচ। পূর্ণ করেন মর্যাদার গোল্ডেন স্ল্যাম। পঞ্চম টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে স্টেফি গ্রাফ, আন্দ্রে আগাসি, রাফায়েল নাদাল ও সেরেনা উইলিয়ামসের পাশে নাম লেখান এ সংক্ষিপ্ত তালিকায়। ডাবলসে পুরুষদের বিভাগে অস্ট্রেলিয়া ও নারী বিভাগে ইতালি জেতে স্বর্ণপদক। নারীদের সিঙ্গেলসে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা হারার ক্ষত পুষিয়ে অলিম্পিক স্বর্ণপদক জেতেন চীনের তারকা ঝেঙ্গকিনওয়েন।
এ ছাড়া ডেভিস কাপে ইতালির দল তাদের দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রেখে শিরোপা জয় করে। ইয়ানিক সিনার নিজেকে প্রমাণ করেন প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে। নারীদের বিলি জিন কিং কাপের শিরোপাও নিজেদের ঘরে তোলে ইতালি। শুধু অর্জনে নয় বিদায় ঘণ্টার ক্ষেত্রেও আলোচিত বছর ছিল ২০২৪। কোটি সমর্থকদের আবেগী করে কিংবদন্তি রাফায়েল নাদাল এবং অ্যান্ডি মারে প্রিয় টেনিস কোর্ট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালে টেনিসে প্রযুক্তিও এগিয়েছে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। হক-আই প্রযুক্তি এবং ভার্চুয়াল রেফারির ব্যবহার কোর্টে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রেখেছে ভূমিকা। তরুণ প্রতিভাদের উত্থান, কিংবদন্তিদের বিদায়, এবং কোর্টে চমৎকার খেলার মুহূর্তগুলো যেমন দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে তেমনি ২০২৫ সালে আরও রোমাঞ্চকর টেনিস দেখার মাদকতায় আসক্ত করবে টেনিসপ্রেমীদের।
