বছর জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকে ফুটবল ও ক্রিকেট। তবে অলিম্পিকের বছরে সবার দৃষ্টি চলে যায় গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে। ২০২৪ ছিল অলিম্পিকের বছর। দুনিয়ার নানা খেলার সেরারা প্যারিসে জড়ো হয়ে নিজেদের মুন্সিয়ানা দেখিয়ে জিতে নিয়েছেন নানা ধাতুর পদক। অলিম্পিক যে দেশগুলোর জন্য পদকের নয়, শুধুই আনুষ্ঠানিকতার, তাদের একটি বাংলাদেশ। এবারও বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা ভালোভাবেই সেরেছে ইউরোপের সমৃদ্ধ শহরে গিয়ে। বরাবরের মতো এবারও সঙ্গী হয়েছে ব্যর্থতার গ্লানি। অলিম্পিকের এই মুখস্থ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ২০২৪ ওলটপালট করে দিয়েছে গোটা ক্রীড়াঙ্গনকে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের। দেশ এখন চলছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। নতুন সরকারের তরুণ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ক্রীড়াক্ষেত্রের দায়িত্ব নিয়েই দিয়েছেন সংস্কারের ডাক। সেই ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে পুরো ক্রীড়াঙ্গন হয়ে গেছে ওলটপালট।
অলিম্পিকের বছর এলেই শুরু হয় অপেক্ষা। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির বদান্যতায় কারা পাবেন অলিম্পিক দর্শনের টিকিট এই হিসেবই কষতে হয় বেশিরভাগ সময়। তবে আরচার সাগর ইসলাম এবার একটু ভিন্নভাবে ভাবিয়েছেন একেবারের আলোচনার বাইরে থেকে। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অলিম্পিক খেলেছিলেন গলফার সিদ্দিকুর রহমান। ২০২০ (হয়েছে ২০২১ সালে) টোকিও গেমসে সিদ্দিকের দেখানো পথে হেঁটে সরাসরি খেলার টিকিট পান আরচার রোমান সানা। প্যারিসে এমন কিছু হবে না ধরে নিয়েই সবার ছিল ওয়াইল্ড কার্ডের অপেক্ষা। কিন্তু রাজশাহীর তরুণ সাগর বিশ্বাসটা রেখেছিলেন ভেতরে ভেতরে। তুরস্কের আনাতোলিয়ায় প্যারিস অলিম্পিকের শেষ কোটা প্লেস টুর্নামেন্টে সাগর রিকার্ভ একক ইভেন্টের সেমিফাইনালে পৌঁছে নিশ্চিত করেন অলিম্পিকের ছাড়পত্র। বিকেএসপির এই ছাত্রকে নিয়ে তখন শুরু হয়ে যায় আলোচনা। পরে অবশ্য মূল মঞ্চে সেভাবে নিজেকে চেনাতে পারেননি সাগর। প্রথম রাউন্ডের ইতালির মাউরো নেসপোলির কাছে হেরে বিদায় নেন তিনি। তার মতো অন্যরাও পারফরম্যান্স নিয়ে নিজেদের আলোচনায় রাখতে পারেননি। আশা ছিল এশিয়ান ইনডোরে সোনাজয়ী স্প্রিন্টার ইমরানুর রহমানকে নিয়ে। তবে চোট লুকিয়ে ফেডারেশন কর্তাদের অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে স্প্রিন্টে নেমে প্রিলিমিনারি পর্ব পার করতে পারেননি যুক্তরাজ্য প্রবাসী ইমরান। শুটিংয়েও রবিউল ইসলামও দিতে পারেননি কোনো সুসংবাদ। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে হন ৪৩তম। দুই সাঁতারু সামিউল ইসলাম ও সোনিয়া খাতুনের মাঝারি মানের পারফরম্যান্স বলে দিয়েছে পদক জয়ের পথ থেকে কত ক্রোশ পিছিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন।
২০২৪ সালে বড় সাফল্যে হিসেবে ধরা যেতে পারে কিশোর দাবাড়ু মনন রেজা নীড়ের আন্তর্জাতিক মাস্টার নর্ম অর্জন। হাঙ্গেরিতে মাত্র ১৪ বছর ৫ মাস বয়সে আন্তর্জাতিক মাস্টার (আইএম) খেতাব অর্জন করে রেকর্ড গড়েন তিনি। এর আগে দেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ ছিলেন দেশের সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক মাস্টার। নিয়াজকে ছাপিয়ে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে আইজিম নর্ম পাওয়া নীড় এবার সবাইকে ছাড়িয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন। এদিকে আন্তর্জাতিক মাস্টার ফাহাদ রহমানেরও একটা প্রাপ্তি আছে এ বছর। দীর্ঘদিনের চেষ্টা এ বছর একটি গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম অর্জন করেছেন তিনি। আরও দুটি নর্ম ও ২৫০০ রেটিং স্পর্শ করলেই ফাহাদ হবে দেশের ষষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার। তবে এই তরুণদের অর্জনের বছরে দাবা অঙ্গনে বড় খবর হয়ে উঠেছিলেন জিএম জিয়াউর রহমান। না, এবার কোনো অর্জন দিয়ে নয়, গত দেড় দশকে দেশের সেরা দাবাড়ু জিয়া দাবা খেলতে খেলতেই চিরতরে বিদায় নিয়েছেন এ বছর ৫ জুলাই। তার অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে।
টুকটাক সাফল্য এসেছে এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিক্স থেকে। ২০২৩ সালে ইমরানুর রহমান হয়েছিলেন এশিয়ান ইনডোরের দ্রুততম মানব। সেই খেতাব ইমরান এবার হারিয়েছেন। তবে ইরান থেকে দুটি পদক এনে দিয়েছেন স্প্রিন্টার জহির রায়হান ও হাই-জাম্পার মাহফুজ আহমেদ। জহির ৪০০ মিটারে জিতেছেন রুপা। আর মাহফুজ জিতেছেন ব্রোঞ্জ। দলগত অর্জনের দিক দিয়ে এগিয়ে রাখতে হবে যুব হকি দলকে। ওমানে অনূর্ধ্ব-২১ এশিয়া কাপ হকি ছিল আগামী বছর ভারতে হতে যাওয়া যুব বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব। এই আসরে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করতে না পারলেও বাংলাদেশ ঠিকই পঞ্চম হয়ে প্রথমবারের মতো হকির কোনো বৈশ্বিক আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। অনিয়মিত হয়ে পড়া হকির টার্ফ থেকে এ এক বড় সুসংবাদ। নানা প্রতিকূলতা জয় করে বিকেএসপির একঝাঁক সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়ের হাত ধরে মিলেছে এই সাফল্য। এটাকে একটা সিঁড়িও বলা যেতে পারে। যে সিঁড়ি দিয়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে দেখতে পারে সিনিয়র বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এ বছর লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে বড় একটা সময় কোটা ক্রীড়াঙ্গনে স্থবির হয়ে পড়েছিল। কোনো খেলাই হয়নি নিয়ম করে। প্রতিটি ক্রীড়া ফেডারেশনে দীর্ঘ দেড় দশক চলেছে রাজনীতিকরণ। ক্ষমতাসীনরা তাদের কাছের মানুষদের এনে বসিয়ে দিয়েছেন ক্রীড়া ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে। তাদের খেলার সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে, কি নেই এসব নিয়ে কেউ ভাবেনি। তাই নতুন সরকার এসেই এক সঙ্গে ৪২টি ক্রীড়া ফেডারেশনের সভাপতিকে অপসারণ করে সংস্কারের শুরু করে। এই উদ্যোগের পুরোধা জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করতে তিনি একেবারে গভীরে গিয়ে সংস্কারের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং গড়েন একটি শক্তিশালী সার্চ কমিটি। যে কমিটির দায়িত্ব ক্রীড়া নীতি সংস্কার করে ফেডারেশনগুলোকে কার্যকর রূপ দিতে একটা রূপরেখা প্রস্তুত করা। এখনই এই কমিটির কর্মকা- চলমান রয়েছে। এর মধ্যেই সরকার ৯টি ফেডারেশনের নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি করেছে। যদিও একাধিক ফেডারেশনে একাধিক আলোচিত, বিতর্কিত ব্যক্তির উপস্থিতি ক্রীড়াঙ্গনকে দিয়েছে সমালোচনার রসদ।
কেবল ক্রীড়া ফেডারেশন নয়। সরকার জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থারগুলোও ভেঙে দিয়েছে। তারা চাচ্ছে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংগঠক ফোরামকে নিঃশেষ করে দিয়ে ক্রীড়াঙ্গনকে মুক্তি দিতে। এই দুই জায়গায় সংস্কারের পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নিজেদের অভ্যন্তরেও চালাচ্ছে শুদ্ধি অভিযান।
২০২৪ সাল তাই দেশের ক্রীড়াঙ্গন মাঠের খেলার চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে পরিবর্তনের দমকা হাওয়া লাগায়।
