১৬ বছর আওয়ামী দুঃশাসনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে গত জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থ পাচার, ব্যাংক লুটপাট, ডলার সংকট, রিজার্ভ হ্রাস, অসাধু সিন্ডিকেটে বিপর্যস্ত ছিল দেশের অর্থনীতি। সাধারণ মানুষ মুক্তি চেয়েছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে। কিন্তু বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক পরিবর্তনে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে পরিবর্তনের ধাক্কায় আরও বেহাল হয়েছে দেশের অর্থনীতি।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সব থেকে বড় সংকট হচ্ছে খেলাপি ঋণ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণকালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। আওয়ামী লীগের টানা তিন আমলে দেশের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। শুধু ব্যাংক খাতেই নয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিতরণ করা ৩৩ শতাংশ ঋণই খেলাপি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, সামনে খেলাপি ঋণ ২৫-৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক খাতে শুরু হয় বড় ধরনের অস্থিরতা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির মুখে সরে যান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরসহ প্রায় পুরো নেতৃত্ব; দাবি উঠে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তনেরও। ৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির মুখে ছয় শীর্ষ কর্মকর্তা ‘পদত্যাগ’ করেন। এরই মধ্যে ১১টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এত দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল। পটপরিবর্তনের পর সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হলে প্রকট তারল্যসংকটে পড়ে ব্যাংকগুলো। এতে গ্রাহকের অস্থিরতা তৈরি হয়। তবে ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক হচ্ছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই ব্যাংক খাতে আমানত ছিল নিম্নমুখী। এখনো সে ধারা অব্যাহত রয়েছে। আমানতের স্থিতি কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কমেছে তারল্যের স্থিতি। সঞ্চয়কারীদের ব্যাংকমুখী করতে অনেক ব্যাংকই আমানতের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। তারপরও ব্যাংকে আমানত প্রবাহ বাড়ছে না।
মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে টাকার জোগান কমিয়ে সুদের হার বাড়াতে হয় এটাই অর্থনীতির স্বাভাবিক রীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার তখন টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি রোধে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে নিয়মিতভাবে ধারে তারল্যের জোগান দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার তথ্য গোপন করে ৬২ দিনে সরকারকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণ দেন। ফলে অর্থনীতির অস্থিরতা এখন চরমপর্যায়ে। অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার ফলে গত ডিসেম্বরের ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি সম্প্রতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপদ থেকে বাঁচার উপায় খুঁজছে অন্তর্বর্তী সরকার।
নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছিলেন, ‘আর টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করা হবে না। কিন্তু ছয়টি দুর্বল ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিতে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাপায় বাংলাদেশ ব্যাংক।’
আওয়ামী দুঃশাসনের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল অর্থ পাচার। সম্প্রতি অর্থ পাচার নিয়ে শে^তপত্র প্রকাশ করেছে টিআইবি। শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় পাচার করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এসব অর্থ পাচার হয়।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে আগের মতোই মুদ্রাসংকোচন নীতিতে হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যে কারণে দফায় দফায় বেড়েছে নীতি সুদহার, যা বর্তমানে ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের ঋণের সুদহারও। সুদ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে চলমান অস্থিরতায় অত্যাবশ্যকীয় নিত্যপণ্য নয় এমন পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। তাতে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বিক্রিতে ধস নেমেছে। সুদহার অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা আপাতত তুলে রাখছেন অনেক উদ্যোক্তা। শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলের যৌক্তিকতা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। গত বছরের জুনেও ব্যাংকঋণের সুদের হার ছিল ৯ শতাংশ।
ডলারসংকট কিছুটা কমলেও এখনো ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। জুলাই-আগস্টে সরকার পতনের আন্দোলন, জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে অর্থনীতিতে অস্থিরতা রয়ে গেছে। বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও নিষ্পত্তি এখনো সহজ হয়নি। এ কারণে আমদানিও কমে গেছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আমদানির এলসি খোলা কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ। এলসি কমায় কমবে আমদানি। এতে প্রভাব পড়তে পারে নিত্যপণ্যে।
জুলাই আন্দোলনের আগে থেকেই দেশে চলছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি শ্রমিক অসন্তোষ। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক শিল্প-কারখানা। ছুটি ঘোষণা করা হয় বেশ কিছু কারখানায়। শ্রমিক আন্দোলনে ঘি ঢালে দুষ্কৃতকারীরা। ঘটে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা। বাড়তে থাকে অস্থিরতা। সব মিলে বেকার হন অনেক শ্রমিক। চাপ পড়ে কর্মসংস্থানে।
ছাত্র-জনতায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ
‘চাপে’ ডলার বাজারে অস্থিরতা
অস্থিরতায়ও সিনেমার জয়গান