দেশে প্রায় টানা তিন মাস স্থিতিশীল থাকার পর ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে ডলার বাজারে। গত সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে ১২৭-১২৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা যায় ডলার। যদিও গতকাল ডলার বাজার ছিল কমতির দিকে। তবে হঠাৎ করেই ডলার বাজার অস্থিরতার পেছনে ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) লক্ষ্য পূর্ণ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছে। যার একটা বড় প্রভাব পড়েছে মার্কেটে। এ ছাড়া বাংলাদেশের রেটিং অবনমনের কারণে বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর করেসপনডেন্ট রিলেশনশিপ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, ফলে ইউপাস এলসি খোলা (আমদানিকৃত পণ্যের পাওনা পরিশোধে সময় থাকে ২৭০ দিন) বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। যার প্রভাবেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে ডলার বাজারে।
গতকাল সোমবার ডলার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ডিসেম্বর মাস বৎসর সমাপনীর মাস। এ কারণে বিভিন্ন ঋণ পরিশোধের ভ্যালু ডেট এই মাসে পড়ে বিধায় (পেমেন্ট শিডিউল) বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া আইএমএফ এর টার্গেট পূর্ণ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছে যা আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের জোগান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের রেটিং অবনমনের কারণে ফরেন ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকসমূহের করেসপনডেন্ট রিলেশনশিপ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, ফলে ইউপাস এলসি খোলা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, পেমেন্টের ম্যাচুরিটি ডেফার্ড করা সম্ভব হয়নি ও অফশোর ব্যাংকিং ঋণের আন্তঃপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বৈদেশিক দেনা পরিশোধ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার বাজারে চাপ বৃদ্ধি করেছে। রেমিট্যান্স আহরণে অ্যাগ্রিগেটরদের একচেটিয়া ও মধ্যস্বত্বভোগী ভূমিকা বাজারে বিনিময় হারকে অস্থিতিশীল করেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের ইনফ্লো-আউটফ্লো মিসম্যাচ এর কারণেও ডলার বাজারে অস্থিতিশীলতা পরিলক্ষিত হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিদেশি মুদ্রার বাজার অস্থিরতা রোধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে রেমিট্যান্স আহরণের বিনিময় হার প্রতি ডলার সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা (ক্রস কারেন্সি হলে তা ক্রস ক্যালকুলেশন করে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা, এর ঊর্ধ্বে হবে না) নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া ড্যাশবোর্ড, ডেটা মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে কিছুদিন কমতে থাকার পর আবারও বাড়ছে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। ডলারের দাম বাড়ায় বেশি বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। একই সঙ্গে যোগ হয়েছে দাতা সংস্থার ঋণ ও অনুদান। সব মিলিয়ে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে গত ২৯ ডিসেম্বর ২৬.০৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নিয়ম মেনে বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ-এর পরিমাণ এখন ২১.৩৩ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবেও আগের চেয়ে বেড়েছে রিজার্ভ।
চলতি ডিসেম্বর মাসে প্রবাসী আয়ের ব্যাপক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একক মাস হিসেবে প্রবাসী আয়ের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। চলতি মাসের গত ২৮ দিনে দেশে ২৪২ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে; দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৯ হাজার ৪০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২০ টাকা ধরে)। দৈনিক গড়ে রেমিট্যান্স এসেছে ৮ কোটি ৬৪ লাখ ডলার। সে হিসাবে প্রতিদিন রেমিট্যান্স আসছে ৮ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। একক মাসে এর আগে ২০২০ সালের জুলাইয়ে সর্বোচ্চ ২৫৯ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল। আর তিন দিন এই ধারা অব্যাহত থাকলে ডিসেম্বরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
