বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল নিয়ে ঐতিহাসিক মদিনা সনদের ভিত্তিতে একটি আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্র গঠন করে শান্তির যে ফল্গুধারা চালু করেছিলেন পৃথিবীতে এর বিকল্প নজির নেই। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার নাগরিক সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা, মানবিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সমুন্নত ও সুসংহত ছিল সেই রাষ্ট্রে। সেই কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের জন্য তিনি আদর্শ ব্যক্তি গঠন ও সমাজ সংস্কারমূলক কিছু কাজকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কারণ রাষ্ট্রের প্রধান উপাদান ব্যক্তি। ব্যক্তিকে যতটা আদর্শ, উন্নত রুচিবোধ ও জ্ঞান মহিমায় সমৃদ্ধ করা যাবে রাষ্ট্র ততটাই সুন্দর, কল্যাণকর ও গৌরবময় হবে। এমনিভাবে সমাজ থেকে যখন অন্যায়-অবিচার ও কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করা যাবে তখন তা আলোকিত হয়ে শান্তির দীপ্তি ছড়াবে। তাই তিনি ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র সংশোধনের পেছনে প্রচুর মেহনত করেছেন। সমাজ সংস্কারে ব্রতী হয়েছেন। ব্যক্তি সংশোধনের প্রথম পদ্ধতি হলো তার অন্তর থেকে যাবতীয় মন্দ স্বভাবের বীজ উপরে ফেলা। যেমন কুফর, শিরক, নেফাক, হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যায় ক্ষোভ, অতিশয় লোভ-লালসা, পরনিন্দা, পরের ক্ষতি করার মনোবৃত্তি, জিঘাংসা প্রভৃতির মতো কদর্যতা মন-মেধা থেকে ঝেড়ে ফেলা। সে কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) করেছিলেন। এরই সঙ্গে ব্যক্তিকে বিশ্ব প্রতিপালকের সঙ্গে নিরঙ্কুশ বিশ্বাস, অগাধ ভক্তিশ্রদ্ধা ও গভীর প্রেম-ভালোবাসার অদৃশ্য বন্ধন গড়ে দিতে পেরেছিলেন। শিখিয়েছিলেন বিনয়-নম্রতা, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, সৃষ্টির প্রতি কর্তব্যজ্ঞান, অল্পেতুষ্টির মতো মহৎ গুণগুলো। এগুলো সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের ফলে, তার ভয়ভীতি অন্তরে ঢোকার কারণে নবী (সা.)-এর সাহাবিদের মধ্যে এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল যা পৃথিবীর ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল। তারা অতীতের যাবতীয় পাপাচার ছেড়ে সোনার মনীষীতে পরিণত হয়েছিলেন। দুনিয়ায় থেকেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। আল্লাহতায়ালা তাদের আচরণে খুশি হয়ে রাদিয়াল্লাহ আনহুম (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট)-এর স্বীকৃতি প্রদান করেছিলেন। যে আরবদের মদ, নারী, জুয়া ছাড়া আসর জমত না, খুন-খারাবি, চুরি-ডাকাতি ছিল নিত্য অভ্যাস, জেনা-ব্যভিচার ছিল সাধারণ বিনোদন; সেই আরবরা (নবী-রাসুলদের পর) দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মনীষীতে পরিণত হয়েছিলেন। তাই একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠন করতে হলে ঐশী বিধানের ভিত্তিতে ব্যক্তিচরিত্রের সংশোধন জরুরি। ব্যক্তিচরিত্র সংশোধনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে আদর্শ নাগরিক ও আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা। আর এ দুয়ের মিশেলে গঠিত হয় একটি সফল আদর্শ রাষ্ট্র কাঠামো। তখন সেই রাষ্ট্রের কিছু জিম্মাদারি থাকে। সেসব জিম্মাদারি বা দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারলে সেই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা অক্ষুণœ থাকে। এই বিষয়ে কয়েকটি দিক উল্লেখ করা হলো।
ইনসাফপূর্ণ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা : বিচারব্যবস্থা একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অথিরিটি। এর স্বচ্ছতা নিতান্ত জরুরি। এটি কোনো দিকে হেলে গেলে রাষ্ট্রের সমস্ত অর্জন বৃথা যাবে। রাষ্ট্রের সব নাগরিক ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে। ধনী-গরিব, মুসলিম অমুসলিমের তফাৎ এখানে থাকতে পারবে না। বিচারককে অবশ্যই পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, আমানতদারিতা ও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নবীজি (সা.) কর্র্তৃক প্রতিষ্ঠিত আদর্শ রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা তেমনই ছিল। একবার তার রাষ্ট্রের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা চুরির মতো অপরাধ করে বসেন। তিনি তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। অভিজাত বংশের (বনি মাখজুম) নারী হওয়ার কারণে হজরত ওসামা (রা.) তার কাছে মহিলার শাস্তি লাঘবের সুপারিশ করলে শক্তকণ্ঠে বলেন, ‘তুমি কি আল্লাহর দণ্ডবিধির ব্যাপারে সুপারিশ করছ? আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবু আমি তার হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ মুসলিম ৪২৬৩)
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা : আদর্শ রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এটি। রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধান করবে। শিশুরা যাতে তাদের সঠিক অধিকার পায়। এতিম-মিসকিন যেন তাদের প্রাপ্য লাভ করে। নারী যাতে অবহেলার শিকার না হয়। বৃদ্ধরা যাতে ঘৃণার পাত্র না হয়। অধীনস্ত লোকেরা যাতে নির্যাতিত না হয়। একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষা-চিকিৎসাসহ যাবতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘প্রত্যেক মুসলমান ভাই ভাই। তোমরা তোমাদের অধীনস্তদের প্রতি যতœশীল হবে। তোমরা যা খাবে তাদেরও তা খেতে দেবে। তোমরা যা পরবে তাদেরও তা পরতে দেবে।’ (সহিহ মুসলিম ১৬৬১)
স্বচ্ছ ও সুষম অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা : স্বচ্ছ বলতে অর্থ উপার্জনের পদ্ধতি বৈধ ও শরিয়তসম্মত হওয়া। বাণিজ্যভিত্তিক ও শ্রমভিত্তিক অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা। সুদ-ঘুষ, জুয়া, চুরি-ছিনতাইসহ সব অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং সম্পদ ব্যয়-বণ্টনে ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ থাকা। জাকাত-ফেতরা, উশর-খেরাজ (ভূমিকর) সঠিকভাবে উত্তোলন করে সঠিক খাতে ব্যয়ের নিশ্চিত বিধান করা।
বৈষম্যের অবসান ঘটানো : একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও শ্রেণি-পেশার নাগরিক থাকে। সেক্ষেত্রে আদর্শ রাষ্ট্রের কাজ হলো সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক, ভৃত্য-মনিব, সাদা-কালোর ভেদাভেদ দূর করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হতে পারো। আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক পরহেজগার।’ (সুরা হুজুরাত ১৩) নবীজি (সা.) বলেন, ‘আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তেমনি অনারবের ওপর আরবেরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। একইভাবে শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের আর কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার ভিত্তি হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। (শুআবুল ইমান)
