স্বৈরাচারী ও লুটেরা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার জন্য যে শ্বেতপত্র প্রকাশ কমিটি গঠন করেছিল, তারা গত ১৫ বছরের নির্মম লুটপাট, ব্যাংক দখল, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। এই শ্বেতপত্র কমিটির সুপারিশ মাথায় রেখে অর্থনীতির জরুরি কিছু শাখায় সংস্কার করবার তাগিদ থেকে ব্যাংকিং খাত, শেয়ারবাজার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ডলারের রিজার্ভ বাড়ানো নিয়ে নানাবিধ উদ্যোগ নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ সময়, বাংলাদেশ থেকে ২৮টি উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে বলে শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে। আমাদের মতো একটি অনুন্নত দেশে অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত অন্তর্বর্তী সরকার তা পরিষ্কার করেনি। তবে বলা হয়েছে, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে স্বাভাবিক করে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা, দেশে দুর্নীতি, অর্থপাচার যাতে না হয় সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সাধারণভাবে সংস্কারের লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে। এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ করা দরকার তাহলো এসব সংস্কার কি বাংলাদেশকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত করবার দিকে নিয়ে যাবে নাকি ‘যেই লাউ সেই কদু’, অর্থাৎ বিকৃত ও চামচা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে? আমরা কি আমাদের সংস্কারের লক্ষ্যের বিষয়ে পরিষ্কার?
সংস্কার নতুন ও উচ্চতর আয় ভারসাম্য তৈরি করে : অর্থনৈতিক একটি মডেলের মাধ্যমে কেমব্রিজ শহরের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ ১৯৮৮ সালে ‘Econometrics and the design of economic reform’ নামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। এটি লিখেছেন মাইকেল ব্রুনো যিনি ১৯৮৮ সালে ব্যাংক অব ইসরায়েলের গভর্নর ছিলেন। তিনি বলছেন, ‘The concept of Economic Reform is described as a planned shift from one, Pareto inefficient, but quasi-stable, equilibrium (or ‘trap’) to a new Pareto superior equilibrium which is, or is designed to become, stable too.’ এর সহজ মানে দাঁড়ায় এই যে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সম্পদ বণ্টনে বড় ধরনের অদক্ষতা কাজ করে। ফলে, একটি নিম্নমানের আধা-স্থায়ী আয় (সম্পদ বণ্টন) ভারসাম্য পরিস্থিতি থেকে পরিকল্পনার (সংস্কারের) মাধ্যমে নতুন উচ্চতর আয় ভারসাম্যে পৌঁছানো যা হবে স্থায়ী। এটিই হলো অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য। ইতালির বিখ্যাত পদার্থবিদ, গণিতবিদ ও অর্থনীতিবিদ ভিলফ্রেডো প্যারিতো (Vilfredo Pareto, 1848-1923) কল্যাণমুখী অর্থনীতির ভিত রচনা করার কারণে তার নাম অনুসারে অর্থনীতেতে কল্যাণ বাড়ানোর একটি তত্ত্ব আবিষ্কার করা হয় যাকে বলা হয় Pareto Optimality Theory। প্যারিতো অপ্টিম্যালিটি হলো একটি অর্থনৈতিক অবস্থা যেখানে অন্তত একজন ব্যক্তির অনুন্নয়ন ছাড়া অন্য একজন ব্যক্তির উন্নয়ন বাড়ানো যায় না। তাহলে, অর্থনীতির ভাষায় বাংলাদেশে সংস্কারের মানে দাঁড়ায় একটি জগাখিচুড়ি আয় ভারসাম্য থেকে স্থায়ী ও উচ্চতর আয় ভারসাম্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা। তবে, এটি কিন্তু সম্পদের সমতা বা ন্যায্যতা বোঝায় না। প্যারিতো দক্ষতা সম্পদের সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে দক্ষ পদ্ধতিতে বরাদ্দ করা বোঝায়। তার গবেষণায় উঠে এসেছিল ইতালিতে ঐ সময়ে ৮০ ভাগ সম্পদ ২০ ভাগ লোকের কাছে গচ্ছিত রয়েছে।
সংস্কারের লক্ষ্যগুলো ঠিক করতে হবে : যেহেতু বাংলাদেশে সম্পদ বণ্টনে চূড়ান্ত বৈষম্য রয়েছে, কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় তলানিতে রয়েছে, নানা আইন থাকা সত্ত্বেও অর্থপাচার ও দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না, তাই এসব ক্ষেত্রই অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের মূল জায়গা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তবে, এটিই চূড়ান্ত বিবেচনা হিসেবে নিলে কৃষক-শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের খুব বেশি উপকার হবে না। তাই, তোষণকারী, চাটুকার পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। ফলে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারগুলোকে এই দায়িত্বগুলো নিতে হবে।
অর্থনৈতিক মুক্তি মেলেনি : আজ থেকে ৭৭ বছর আগে ব্রিটেন থেকে ভারতবর্ষ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন হয়েছিল। ঘটনার পরম্পরায়, তারপর পাকিস্তান এবং পরিশেষে বংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলেও জনমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। কলোনি থেকে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও ব্রিটিশরা ও পরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নানা কৌশলে বিশেষত বাংলাদেশসহ অন্য অনুন্নত দেশগুলোকে তাদের নানাবিধ পণ্যের বাজার (অস্ত্র, উন্নত প্রযুক্তি, ওষুধ, কেমিক্যালস, ইলেকট্রনিক্স)-এ পরিণত করেছে। ফলে সংস্কারের মূল কাজ হওয়া উচিত ঐসব দেশের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানো। এজন্য নিজস্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন করতে হবে, শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার সুষম বণ্টন করতে হবে। নব্য মার্ক্সবাদী লেখক-তাত্ত্বিক মিসরীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি প-িত সামির আমিন (১৯৩১-২০১৮) কলোনি-পরবর্তী বৈশ্বিক পুঁজিবাদ, নির্ভরশীলতা তত্ত্ব এবং গ্লোবাল সাউথের অনুন্নয়নের গতিশীলতার অধ্যয়ন করেছেন ব্যাপক। তিনি বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতি একটি প্রভাবশালী ‘কেন্দ্র’ (উন্নত দেশ) এবং একটি অধীনস্ত ‘পরিধি’ (উন্নয়নশীল দেশ)-এ বিভক্ত। কেন্দ্র অসম বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিধিকে শোষণ করে এবং নির্ভরশীলতার অবস্থাকে স্থায়ী করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে কেন্দ্র হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপ আর পরিধি হলো ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার কিছু দেশ।
বাংলাদেশে দুর্নীতি বৈধ : দীর্ঘদিন ধরে চলে আসার কারণে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নকামী দেশে দুর্নীতি একটি বৈধতা পেয়ে গেছে। সরকারি অনেক সেবা গ্রহণ করতে ভোক্তাকে ঘুষ দিতে হয়। বিভিন্ন ইউটিলিটি অফিস, পাসপোর্ট অফিস (আগে), ভূমি অফিস, সিটি করপোরেশন, রাজউক, আমদানি-রপ্তানি লাইসেন্সসহ আরও শত শত জায়গায় ঘুষ বা স্পিড মানি না দিলে কাজ হয় না। সে কারণে তিতাসের মিটার রিডারের শত শত কোটি টাকার সম্পদ পাওয়া যায়। মন্ত্রীর গাড়ির ড্রাইভার, গুরুত্বপূর্ণ অফিসের পিয়ন এমনকি পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিয়নের কাছে ৪০০ কোটি টাকার অবৈধ অর্থ পাওয়া গেছে। সামাজিকভাবে এবং অনেকটা বাধ্য হয়েই দুর্নীতিকে আমরা মেনে নিয়েছি। এটির আমূল পরিবর্তন দরকার। দুর্নীতি দমন কমিশনকে বানানো হয়েছে দন্ত-নখরবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানে। সরকারি কেউ দুর্নীতি করলে, অপরাধ করলে সরকারের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিয়ে থানায় মামলা করার আইন করার পর থেকে আমরা দেখলাম আমলারা দুঃশীল, অন্যায় কাজ করার ক্ষেত্রে বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। তারা কতিপয় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে জোট (Oligarch, Nexus) ডলার। এই পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন দরকার যার জন্য বেশ কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। এদেশে অ্যান্টি ব্রাইবারি অ্যাাক্ট আরও শক্তপোক্ত করে করতে হবে, প্রয়োগ করবে স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান যা একটি Ethics Commission তত্ত্বাবধান করবে।
কয়েকটি স্থানে সংস্কার বেশি দরকার : কেমব্রিজ শহরের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ পাকিস্তানের ওপর একটি গবেষণা চালিয়েছে যার শিরোনাম Informal Fiscal Systems in Developing Countries। গত বছরের অক্টোবরে এটি প্রকাশ করা হয়। তাতে বলা হয়েছে, (পাকিস্তান) সরকার পুলিশ টহলের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাই বাকি অর্থ পুলিশকেই সংগ্রহ করতে হয়। সরকার যে বিষয়টি জানে না তা নয়। একই ভাবে জেলা প্রশাসকরা সেখানে একটি ফান্ড গঠন করেন। সেখান থেকে বন্যার সময় বা অন্যান্য সময় গরিবদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। একটি উদাহরণ দিয়ে ঐ গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে জমির নামজারি বাবদ যে ঘুষ নেওয়া হয়, তা গরিব মানুষের খাবারের জন্য ব্যয় করা হয়ে থাকে। আর সরকারি সেবা পেতে নাগরিকরা তো নানা ফি দিচ্ছেনই। সেটি সরকারের কোষাগারে চলে যায়। অর্থাৎ, অবশেষে, অনানুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায়, রাষ্ট্র নিজেই আশা করে যে তার কর্মীরা জনসেবা প্রদানের জন্য এ ধরনের অবৈধ কাজ করবে। বাংলাদেশেও এই ব্যবস্থা চালু আছে। যারা ডেপুটি কমিশনারের কাছে থেকে নানা অবাঞ্ছিত সুবিধা নেন, তারা ঐ ফান্ডে এমনকি ডিসিকেও অবৈধ অর্থ প্রদান করেন। এ বিষয়ে আইন করে এ ধরনের ফান্ডিং বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের ব্যবস্থার কারণে সরকারি জায়গা দখল হয়ে যায়, গরিব মানুষকে বাস্তুহারা করা সম্ভব হয় ও অন্যান্য নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় যে সংস্কারটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলো অর্থ ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংককে সবল করার চেষ্টা করা। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় আর ব্যাংকগুলোর এমন ধারণা হয় যে তাদের রক্ষার জন্য সরকার তো আছেনই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ডিসট্রেসড অ্যাসেট বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। তবে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির একটি সূত্র বাংলা এক দৈনিককে বলেছে, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ আরও অনেক বেশি। কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঐ দৈনিককে জানিয়েছেন, শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ হয়ে থাকতে পারে প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক যে তথ্য দিয়েছে, শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ তার থেকে ঢের বেশি। যে জায়গাটি সংস্কারকারীদের নজর এড়িয়ে যায় তা হলো, ব্যাংক বাঁচাতে গিয়ে, উদারনৈতিক অর্থব্যবস্থা চালু করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণ কমে আসে। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে যে বন্ড বা সিকিউরিটিজ ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনে নেয়, তা অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি তৈরি করে। তাতে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ কমে যায়। এদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঘাটতি থাকার কারণে সরকারকে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকেই ঋণ নিতে হয়। তাতে করে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ হ্রাস পায়। মোটের ওপর বলা যেতে পারে যে সংস্কার অন্তর্বর্তী সরকার করতে যাচ্ছেন, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক হতে পারে। কিন্তু এসব সংস্কার ছাড়া এদেশে সমতাভিত্তিক সমাজ ও টেকসই রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক