‘আগামী নির্বাচন হবে অত্যন্ত কঠিন’

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:৩০ এএম

স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। যে জাতীয়তাবাদের প্রায়োগিক রূপরেখা ছিল ১৯ দফা। সময়ের পরিক্রমায় বাস্তবতার নিরিখে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের তাগিদে ১৯ দফার রূপান্তর ঘটেছে। যুগের তাগিদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতির ক্রান্তিলগ্নে প্রস্তাব করেন ভিশন-২০৩০। আবারও সময়ের পরিক্রমায় বাস্তবতার নিরিখে রূপান্তরিত ১৯ দফা ও ভিশন-২০৩০ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সমন্বয় ও নির্দেশনার ভেতর দিয়ে রূপপরিগ্রহ করেছে দেশের সব গণতান্ত্রিক দল-মতের অন্তর্ভুক্তিমূলক ৩১ দফায়। সর্বশেষ তিনি ৩১ দফাকে এক সুতায় বেঁধে দিয়েছেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী দলগুলোকে এবং সেই সঙ্গে রচনা করেন বৈচিত্র্যের ভেতর ঐক্যের দর্শন। সম্প্রতি উদযাপিত হয়ে যাওয়া ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কনসার্টের নামকরণের ভেতর দিয়ে তারেক রহমান যে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন সেই বাংলাদেশ মনে করিয়ে দেয়, তার প্রয়াত পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই বাক্যটি যেখানে উচ্চারিত হয়েছে, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড় আর দলের চেয়ে দেশ বড়’।

বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামল যে ঘুণে ধরা, পঙ্কিল ও ভঙ্গুর রাষ্ট্র রেখে গেছে, সেই রাষ্ট্র মেরামত ও যথাযথ নির্মাণে ৩১ দফার বাস্তবায়ন শুধু মহৌষধই নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে অনিবার্যতা। তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন আমাদের জানিয়ে দেয় রাষ্ট্র ভূমিকে বাসযোগ্য করে তুলতে মানুষের মনোভূমি নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। ঘরে ঘরে ৩১ দফা পৌঁছে দেওয়ার ভেতর দিয়ে প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের রাজনৈতিক দর্শনকে সমৃদ্ধ করার ভেতর দিয়ে নির্মিত হবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। রাষ্ট্র কোনো বায়বীয় ধারণা নয়, বরং রাষ্ট্র হলো একটি প্রায়োগিক দর্শন। রাজা চতুর্দশ লুই বলেছিলেন ‘আমিই রাষ্ট্র’। সেই চতুর্দশ লুইকে প্রাণ দিতে হয়েছিল গিলোটিনে। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাও মনে করতেন ‘তিনিই বাংলাদেশ’! শেষ পর্যন্ত গণভবনের পেছনের দরজা দিয়ে তাকে পালিয়ে বাঁচতে হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মনে করেন, ৩১ দফা বাস্তবায়নের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের মালিকানা হবে দেশের সব জনগণ এবং যে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালিত হবে ন্যায্যতা ও সাম্যের ভিত্তিতে এবং সব মানুষের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে। তারেক রহমান তার প্রতিটি বক্তব্যে বারবার বলছেন দলীয় নেতাকর্মীকে জনগণের মনকে জয় করতে হবে আর জনগণের মন জিতে নেওয়ার ভেতর দিয়েই বিএনপিকে প্রকৃত অর্থে পরিণত হতে হবে জনগণের দলে। মনে রাখতে হবে, আগামীর বাংলাদেশ হবে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনের ভেতর দিয়ে একটি উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ। যে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করবে বহুল কাক্সিক্ষত  ৩১ দফা।

অতি সম্প্রতি তিনি নিজের একটি বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন তার পিতাকে হত্যা করা হয়েছে, তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সীমাহীন কষ্ট ও ত্যাগ শিকার করেছেন। তার কনিষ্ঠ ভাইকে হত্যা করা হয়েছে এবং তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এক নির্বাসিত জীবনে। বলেছেন এসব ভুলে গিয়ে তিনি ৩১ দফার নিরিখে নির্মাণ করতে চান ভারতীয় নাগপাশ থেকে মুক্ত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে বাংলাদেশের জনগণ পিষ্ট। গত ১৭ বছরে আওয়ামী শাসনামলে  সেটি এমন রূপ পরিগ্রহ করেছিল যাতে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল দেশের আপামর জনসাধারণের। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করেছে তাই নয়, বরং সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশকে বিপন্ন করে সার্বভৌমত্বকে হুমকির সম্মুখীন করেছে। গত ৫ আগস্ট গণবিপ্লব-পরবর্তী সময় দেশের জনগণ এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, সেই বাংলাদেশ হবে স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বনির্ভর। আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা হচ্ছে ভারতীয় আগ্রাসনমুক্ত সেই সার্বভৌম ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার বীজ, যে বাংলাদেশ ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আজন্ম লালিত স্বপ্ন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার প্রথম দফায় এক যুগান্তকারী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিক। তারেক রহমান তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র। বাবা-মা রাষ্ট্রীয় সফরে নেপাল যাবেন। এর আগে নেপালের রাজা সপরিবারে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। এক সন্ধ্যায় বাবাকে কাছে পেয়ে মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বাবাকে বললেন, ‘রাজার ছেলে যদি রাজার সঙ্গে বেড়াতে যেতে পারে, আমরা কেন তোমার সঙ্গে যেতে পারব না?’ সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি বাবা বলে উঠলেন, ‘তোমরা কোনো রাজার ছেলে নও’। অতি সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার অসাধারণ গুণাবলি দিয়ে নিজের সন্তানদের দেশের সাধারণ মানুষের মতোই বড় করেছিলেন। বাবার রাষ্ট্রনায়োকচিত সেসব গুণাবলির ধারক ও বাহক তারেক রহমান আজ আরও পরিপক্ব এবং দেশ ও জনগণের দায়িত্ব নেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে। তিনি যখন বলেন, আগামী নির্বাচন হবে অত্যন্ত কঠিন একটি নির্বাচন তখন আমরা তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কথা জেনে যাই। যখন বলেন, প্রতিপক্ষকে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা, আমরা তার উদারতাকে অনুভব করি। যখন বাংলাদেশের জনগণকে সঙ্গে করে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণের আকাক্সক্ষা পুনরায় ব্যক্ত করেন; তখন বক্তব্যের ভেতর আমরা খুঁজে পাই একজন পরিপূর্ণ স্টেটসম্যান। আর এই তারেক রহমানের নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হবে নতুন প্রজন্মের কাক্সিক্ষত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত