পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন নতুন কিছু না। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো দেশ, জাতির ইতিহাস পরিবর্তিত হয় এমন দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল। পূর্ববর্তী সরকারের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন, সে সময় অনেককেই অবাক করেছিল। অথচ শিক্ষার্থীরা সেই বই পড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এবার অনেকটা নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকেই পাঠ্যপুস্তকে সর্বজনীন পরিবর্তন নিয়ে আসা হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব পাঠ্যবইয়ে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। ২০২৬ সাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যপুস্তক ও মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর হবে। মাধ্যমিকের প্রতি শ্রেণির বাংলা বইয়ে যুক্ত হচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে লেখা, কবিতা অথবা কার্টুন। প্রতিটি বইয়ের পেছনের কভারে থাকছে গ্রাফিতি। এর বাইরে ইতিহাসনির্ভর অনেক বিষয়ে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে পাঠ্যবই থেকে বাদ যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ‘অতিরঞ্জিত’ চিত্র। বাদ দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত শেখ মুজিববন্দনা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা প্রাধান্য পেয়েছিল। নতুন বইতে মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী ও মেজর জিয়াউর রহমানের অবদানও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এনসিটিবি সূত্র বলছে, পাঠ্যবইয়ে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমানের নাম যুক্ত করা হয়েছে। বাদ যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত কবিতাসহ কিছু ‘অতিরঞ্জিত’ ইতিহাস ও তথ্যগত ভুল।
পাঠ্যবইয়ের পেছনের মলাটে নেই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাণী। সেখানে যুক্ত হয়েছে জুলাই-আগস্ট গণ-আন্দোলনের সময়ে শিক্ষার্থীদের আঁকা গ্রাফিতি। একই সঙ্গে জুলাই-আগস্ট গণ-আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধদের ‘বীরত্বগাথা’ পাঠ্যবইতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর বাড্ডায় হেলিকপ্টার থেকে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করার বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে কার্টুনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সন্দেহ নেই, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনায় এই পরিবর্তনগুলো শিক্ষার মানকে উন্নত করবে এবং শিক্ষার্থীদের আরও কার্যকরী উপায়ে শিখতে সাহায্য করবে। ডিজিটাল বই এবং আধুনিক ডিজাইন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক ও সহজ করে তুলবে। একই সঙ্গে নতুন বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেন, ‘নতুন বছরের বইতে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। ইতিহাসের অংশ থেকে অতিবন্দনা, অতিকথন বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ও বিশ^পরিচয় বইয়ে বেশ কিছু সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে, যেখানে নতুন করে স্থান পাচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থী ও মানুষের আন্দোলন বেগবান করতে দুই র্যাপার হান্নান ও সেজান গান করেছিলেন। সেই গানগুলো এবার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেছে সরকার। পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এবার পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হয়েছে মায়ের ডাক সংগঠনের কথা। গুম-খুনের প্রতিবাদে যে সম্মিলিত মঞ্চ গড়ে উঠেছে সেটাই পরিচিতি পায় মায়ের ডাক নামে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের নতুন বইগুলো আধুনিক, সহজবোধ্য এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উপযোগী হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন আধুনিক জ্ঞান অর্জন করবে, তেমনি তাদের চিন্তা-ভাবনা এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে পাঠ্যপুস্তক থেকে একেবারে মুছে ফেলা হয় তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাম। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখা অনেক বীর ছিলেন অপাঙ্ক্তেয়। জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতিহাসে সবার সব অবদান নির্মোহভাবে পাঠ্যবইতে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেজন্যই প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব পাঠ্যবই সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, কোনো পরিবর্তনই যেন দলীয় চিন্তা থেকে না হয়ে সর্বজনীন হয় সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসকে সঙ্গী করে, সময়ের সঙ্গে চলমান বিষয় যুক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার নামই স্বাধীনতা।