ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ৪ স্থান

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৫, ০৩:১৪ এএম

কোনো স্থানের খ্যাতি সেখানকার মহান ব্যক্তিত্ব, স্মৃতিস্তম্ভ ও পবিত্র সম্বন্ধীয় স্থানগুলোর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। ফিলিস্তিনে অনেক নবী-রাসুল আগমন করেছেন। তাদের পদধূলিতে সেখানের অনেক স্থান পুণ্য ও বরকতময় হয়েছে। ফিলিস্তিনের ভূমি অত্যন্ত ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের অধিকারী। এই পুণ্য ও বরকতময় অঞ্চলে নবীদের পবিত্র সমাধি এবং অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভও রয়েছে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে ১৫ হিজরি মোতাবেক ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানরা এই অঞ্চল জয় করে। (আল মুনতাজাম ৪/১৯১) নিম্নে কয়েকটি শহর ও স্থানের ইতিবৃত্ত উল্লেখ করা হলো, যদিও বর্তমানে সেগুলোর ভৌগোলিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।

আল কুদস : এটি ফিলিস্তিনের সবচেয়ে বিখ্যাত শহর। এটিকে বাইতুল মাকদিস এবং জেরুজালেমও বলা হয়। ইমাম কাজবিনি (রহ.) এই শহরের অনেক গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন যে, এটি সেই বিখ্যাত শহর যা আম্বিয়ায়ে কেরাম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি নবী-রাসুলের আবাসস্থল ছিল এবং এখানেই ওহি নাজিল হয়েছিল। (আসারুল বিলাদ ওয়া আখবারুল ইবাদ ১/১৬০)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, বায়তুল মাকদিস নবীদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং এখানেই নবী-রাসুলরা বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই শহরে এমন কোনো স্থান নেই যেখানে কোনো নবী নামাজ পড়েননি কিংবা অবস্থান করেননি। (মুজামুল বুলদান ৫/১৬৭) হজরত সুলাইমান (আ.)-এর সময়ে এই শহরটি ছিল তার সময়ের সবচেয়ে সুন্দর শহর। আর তিনি বায়তুল মাকদিসকে দৃষ্টিনন্দন করে নির্মাণ করেছিলেন। এই শহরেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাশালী আল-আকসা মসজিদ, যাকে মহান আল্লাহ মহিমা ও মর্যাদায় ধন্য করেছেন এবং ইসলামি স্মৃতিস্তম্ভ কুব্বাতুস সাখরা (ডোম অফ দ্য রক)-ও রয়েছে। আর এটি অত্যাচারী শাসকরা দখল করে ক্ষতিসাধন করেছে। (আসারুল বিলাদ ওয়া আখবারুল ইবাদ ১/১৬০)

হজরত উজাইর (আ.)-এর কোরআনি ঘটনাও এই এলাকায় ঘটেছে। এখানকার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ, ভবনগুলো সবচেয়ে সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন এবং মসজিদগুলো খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এখানে মহানবী (সা.)-এর বোরাক বাঁধা হয়েছিল। এখানে হজরত মারইয়াম (আ.)-এর মিহরাব ছিল, যেখানে তাকে এমন মৌসুমের ফল দেওয়া হতো, যে মৌসুম তখন ছিল না। অনুরূপভাবে হজরত জাকারিয়া (আ.)-কে এখানেই তার পুত্র হজরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল। (প্রাগুক্ত ১/১৬১-১৬৩)

এটি সেই শহর যেখানে হাশরের ময়দান প্রতিষ্ঠিত হবে। হজরত সামুরা বিন জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের বলেছেন, বাইতুল মাকদিসে তোমাদের হাশর হবে, তারপর কেয়ামতের দিন তোমাদের একত্র করা হবে। (মুজামুল কাবির ৭/২৬৪, হাদিস নং ৭০৭৬)

আল-খলিল (হেবরন) : ফিলিস্তিনে আল কুদসের পর এই শহরটিকে সবচেয়ে পবিত্র বলে মনে করা হয়। কারণ এখানে মসজিদে ইব্রাহিম আল খলিল অবস্থিত। যেখানে হজরত ইব্রাহিম ও হজরত ইসহাক (আ.)-সহ তার বংশের অন্য মহান ব্যক্তিদের মাজার রয়েছে। (তারিখুল ইসলাম ৩৫/২৮০)

এখানে আগে একটি গুহা ছিল, যা হজরত ইব্রাহিম (আ.) ৪০০ মিসকাল (বর্তমান হিসাব অনুপাতে আনুমানিক ১৫০ ভরি) স্বর্ণ দিয়ে ক্রয় করেছিলেন। আর এখানেই হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর স্ত্রী হজরত সারাকে প্রথম দাফন করা হয়েছিল এবং পরে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কেও এখানে দাফন করা হয়। (কাসাসুল আম্বিয়া ২৩৬-২৩৭)

বায়তু লাহম (বেথলেহেম) : এটি ফিলিস্তিনের সেই গ্রাম যেখানে হজরত ইসা (আ.)-এর জন্ম হয়েছিল। (তাফসিরে তাবারি ১৫/৪৯২) মিরাজের রাতে হজরত জিবরাইল (আ.) মহানবী (সা.)-কে একটি স্থানে নেমে নামাজ পড়তে বলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে নামাজ আদায় করেন। অতঃপর হজরত জিবরাইল (আ.) বললেন, আপনি কি জানেন আপনি কোথায় নামাজ আদায় করলেন? আপনি বায়তু লাহমে (বেথলেহেম) নামাজ আদায় করলেন, যেখানে হজরত ইসা (আ.)-এর জন্ম হয়েছিল। (সুনানে নাসায়ি ৪৪৮)

মুহাদ্দিসরা এ হাদিসের ব্যাখ্যা করেছেন যে, হজরত ইসা (আ.)-এর জন্মের সময় ঘনিয়ে এলে মারইয়াম (আ.) ইলিয়া শহর থেকে ৬ মাইল দূরে জঙ্গলে বায়তু লাহম (বেথলেহেম) নামক স্থানে চলে যান। আর ‘ইলিয়া’-এর অপর নাম হলো বায়তুল মাকদিস। (তাফসিরে তাবারি ১৫/৪৯২)

সেখানে একটি শুকনো বৃক্ষ ছিল, যার পাতা ও ডালপালা সব ঝরে গিয়েছিল এবং কেবলমাত্র কাণ্ডটিই অবশিষ্ট ছিল। তখন খুবই ঠাণ্ডার মৌসুম ছিল। হজরত মারইয়াম (আ.) উক্ত গাছের শেকড়ের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসেছিলেন এবং এখানেই হজরত ইসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। (হাশিয়ায়ে জামাল ৫/১৪)

গাজা (গাজ্জা) : এটি ফিলিস্তিনের আসকালান শহরের পশ্চিমে অবস্থিত একটি শহর। এটি সেই স্থান যেখানে মহানবী (সা.)-এর সম্মানিত পিতামহ হাশিম বিন আবদে মানাফ ইন্তেকাল করেছেন এবং তার কবর এখানেই রয়েছে। (মুজামুল বুলদান ৪/২০২) রাসুলুল্লাহ (সা.) এই শহরকে নববধূ উপাধিতে ভূষিত করেছেন এবং এখানে বসবাসকারীকে সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ধন্য সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ দুই নববধূ আসকালান বা গাজার যেকোনো একটিতে বসবাস করার তওফিক দান করেছেন। (আল ফিরদাউস বিমাসুরিল খিতাব ২/৪৫০ হাদিস নং ৩৯৪০) তবে এই হাদিসের ব্যাপারের মুহাদ্দিসরা বলেছেন যে, এটি সনদের দিক থেকে দুর্বল

এই শহরটিও হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) কর্র্তৃক বিজিত হয়েছিল। মুসলিম বিশ্বের মহান ব্যক্তিত্ব, চার ইমামের একজন হজরত ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস শাফিয়ি (রহ.) ১৫০ হিজরিতে এই গাজা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার মাজার রয়েছে কায়রোতে। (ওয়াফায়াতুল আইয়ান ৪/২৩)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত