দীর্ঘ ৩২ বছর অচলাবস্থার পর অবশেষে খুলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের দুয়ার। এই নির্বাচন আয়োজনে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসকে সামনে রেখে পরিকল্পনা সাজিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছাত্র সংগঠনগুলোও প্রশাসনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে জাকসুর গঠনতন্ত্রে সংস্কার চায় ছাত্রদলের একাংশ।
জাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯২ সালে। এক বছর মেয়াদি ওই কমিটির মেয়াদ শেষে আর কোনো নির্বাচন হয়নি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে কোনো নির্বাচন না হওয়ায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল জাকসু ভবন। শুধু শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠান ও র্যাগের অনুষ্ঠান উপলক্ষে আড্ডার কাজে এই ভবনকে ব্যবহার করতেন শিক্ষার্থীরা। অবশেষে খুলতে যাচ্ছে জাকসু ভবনের বন্ধ দুয়ার। দীর্ঘদিন ধরে জাকসুর নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। তবে এতদিন ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দাবি জোরালো হয়ে ওঠে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়ার পর থেকে জাকসুর নির্বাচনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নির্বাচনের আগের দিন গত ১ ডিসেম্বর জাকসু নির্বাচনের স্পষ্ট রূপরেখা ও জুলাই মাসে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী শিক্ষকদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষক সমিতির নির্বাচন স্থগিত রাখার জন্য আহ্বান জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার নেতাকর্মীর। অন্যথায় তারা কঠোর অবস্থানে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। ওইদিন রাতে পরবর্তী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে জাকসুর নির্বাচনের রূপরেখা প্রকাশের ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে গত ৩০ ডিসেম্বর জাকসুর নির্বাচনী রূপরেখা ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। রূপরেখায় আগামী ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচন উপলক্ষে গত ৩১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামানকে প্রধান নির্বাচনী কমিশনার ও সভাপতি এবং প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলমকে সদস্য সচিব করে পাঁচ সদস্যের একটি নির্বাচন কমিশন নিয়োগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। জাকসু নির্বাচন আয়োজনে প্রশাসনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের একাংশের সভাপতি আলিফ মাহমুদ বলেন, জাকসু শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি। আমরা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি জাকসুর দাবিতে। জাকসু হলে শিক্ষার্থী অধিকার আদায় ও সুরক্ষার কাজ সহজ হবে।
জাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি হারুনুর রশিদ রাফি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশা-আকাক্সক্ষার জন্ম দিয়েছে। ক্যাম্পাসকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির দখলদারিত্ব মুক্ত করা ও অ্যাকাডেমিক অধিকার নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আশা করি এ নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরিতে জাকসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জাকসুর রূপরেখা প্রণয়নসহ জাকসু সম্পর্কিত উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও গঠনতন্ত্রে কিছু সংস্কারের প্রস্তাব রেখেছেন শাখা ছাত্রদলের সর্বশেষ বিলুপ্ত কমিটির সহসভাপতি ও ৩৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. ফয়সাল হোসেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসনের প্রায় অর্ধেক ছাত্রী হওয়ার পরেও জাকসুতে ছাত্রী প্রতিনিধি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেই। তার প্রস্তাব, সহসভাপতি পদে একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে রাখতে হবে। এ ছাড়া সভাপতি পদে নির্বাচন দিতে হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার সদস্য সচিব তৌহিদ সিয়াম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রশাসনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। জাকসু আমাদের যৌক্তিক দাবি। জাকসু হলে সংস্কারের পথ আরও সহজ হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে জাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাক।