অভিযোগ ওঠা সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারপতির বিষয়ে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। আগামী সপ্তাহে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তদন্ত শুরু করবে। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গতকাল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ‘নিউজ আপডেট’র স্ক্রলে এ সংক্রান্ত তথ্যে বলা হয়, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬ (৫) (বি) অনুসরণ করে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারপতির বিষয়ে তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে নির্দেশনা প্রেরণ করেছেন। সে অনুযায়ী সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আগামী সপ্তাহে তদন্ত শুরু করবে।’
গত বছর ১৫ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছিল, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারপতির আচরণবিষয়ক তথ্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। এর আগে গত ৪ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণ অভিযোগ-সংক্রান্ত প্রাথমিক তদন্ত করছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং এ তদন্তের অগ্রগতি হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গত ১৬ অক্টোবর বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের অবস্থান ও বিক্ষোভের সময় কয়েকজন বিচারপতির পদত্যাগের দাবি ওঠে। এদিন প্রধান বিচারপতির বরাত দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের ১২ বিচারককে বেঞ্চ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। ১২ বিচারক হলেনÑ বিচারপতি আতাউর রহমান খান, বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ, বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার, বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস, বিচারপতি খিজির হায়াত, বিচারপতি এসএম মনিরুজ্জামান, বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামান, বিচারপতি শাহেদ নূর উদ্দিন, বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামান, বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিচারপতি এসএম মাসুদ হোসাইন দোলন। এ বিচারকরা ওইদিন থেকে বিচারকাজের বাইরে আছেন এবং তারা ছুটিতে যান। এর আগে পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে অসদাচরণের অভিযোগ ওঠা তিন বিচারক গত বছর ১৯ নভেম্বর পদত্যাগ করেন। তারা হলেন সালমা মাসুদ চৌধুরী, কাজী রেজা-উল হক এবং এ কে এম জহিরুল হক।
উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনে তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। পরে এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ৫ মে রায়। হাইকোর্টের রায়ে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ওই বছর ৩ জুলাই হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে রায় দেয় আপিল বিভাগ। পরে আপিল বিভাগের এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। গত ২০ অক্টোবর আপিল বিভাগ রিভিউ নিষ্পত্তি করে রায় দিলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল হয়।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের গঠন, কাজ করে কীভাবে : ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা ছিল জাতীয় সংসদের কাছে। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সরকারের সময়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ-সংক্রান্ত এ ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর আগে ৯৬ অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ দুজন বিচারপতিকে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন হবে। কাউন্সিলের কোনো সদস্য অনুপস্থিত, অসুস্থ কিংবা অসমর্থ হলে কিংবা কাউন্সিলের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি অসদাচরণের তদন্ত চলে, তাহলে আপিল বিভাগের পরবর্তী জ্যেষ্ঠ বিচারক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন।
৯৬ অনুচ্ছেদের সংশ্লিষ্ট উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাউন্সিল বিচারকদের জন্য পালনীয় একটি আচরণবিধি নির্ধারণ করবে এবং বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সে বিষয়ে তদন্ত করবে। কাউন্সিল অথবা অন্য কোনো সূত্র থেকে রাষ্ট্রপতি যদি অবগত হন যে, কোনো বিচারক শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য বা তার বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে, তাহলে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি তদন্ত করে ফলাফল জানানোর নির্দেশ দেবেন। তদন্তের পর কাউন্সিল যদি সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বা তার অসামর্থ্যরে প্রমাণ পায় এবং বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে জানানোর পর রাষ্ট্রপতি ওই বিচারককে অপসারণের নির্দেশ দেবেন।
