তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প

ড্রেজার মেশিন নষ্ট তিন বছর, বোমা মেশিন দিয়ে সিলটাপ খনন চলছে

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৫, ১০:৪০ পিএম

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের সিলটাপ খনন নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। ড্রেজার মেশিন তিন বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকায় শ্যালো চালিত বোমা মেশিন দিয়ে খনন করা হচ্ছে। এতে পরিপূর্ণতা পাচ্ছে না খনন কাজ। বুধবার (৮ জানুয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায় সিলটাপ খনন করা হচ্ছে পাঁচটি বোমা মেশিন দিয়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন জানান, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের নদী-খাল-পুকুর খনন প্রকল্পের আওতায় তিস্তার সেচ প্রকল্পের প্রধান খালে (সিলটাপ) সেচ ক্যানেলে জমে থাকা পলিমাটি অপসারণে খনন কাজ শুরু করে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড। বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৯ লাখ টাকা। খননের কাজ দেওয়া হয় মেসার্স ‘সাইকি বিল্ডার্স’ নামে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। ইতোমধ্যেই খননের বালু উত্তোলনের জায়গা গুলোতে তৈরি হয়েছে গভীরতা। 

অন্যদিকে উত্তোলিত বালু তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে ফেলা হচ্ছে, যা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে সেচ নালার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে তিস্তা ব্যারাজ ২০০ মিটার দূরত্বে চলছে সেচ ক্যানেলের খনন। ফলে ক্যানেলের তলদেশে প্রায় ২৫-৩০ ফুট গভীরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আশপাশের স্থাপনাগুলোর স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এতে ক্যানেলের দুই পার দেবে বাঁধ ও সিসি ব্লক ধসে যেতে পারে। 

জানা যায়, তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের পর ১৯৯৩ সাল থেকে সেচ সরবরাহ করছে। ৬১৫ মিটার দীর্ঘ ব্যারাজ উত্তর থেকে আসা পানি আটকে দেয়। ব্যারাজে ৪৪টি গেট আছে। উত্তরে পানি বেশি থাকলে বেশি সংখ্যক গেট খুলে দেওয়া হয়। পানি আসা কমতে থাকলে এক এক করে সব গেট বন্ধ করা হয়। উজানের ভারত থেকে আসা নদীর পানি বাংলাদেশ অংশের তিনবিঘা করিডোর দহগ্রাম থেকে পূর্বছাতনাই ও পশ্চিমছাতনাইয়ের কালিগঞ্জ হয়ে ডালিয়া পর্যন্ত এই ১৯ কিলোমিটার সেচের পানির আঁধার বা রিজার্ভার হিসেবে কাজ করে। এই আটকানো পানি সেচের জন্য নেওয়া হয় আটটি রেগুলেটর গেট দিয়ে সিলটাপে। তারপর সিলটাপে নদীর কাঁদা বা ময়লা পানি নেটের জালের মাধ্যমে ছেঁকে স্বচ্ছ করে ক্যানেলে ছাড়া হয়। তিনটি জেলার (নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর) ১২টি উপজেলায় জালের মতো ছড়িয়ে আছে প্রকল্পের খাল বা ক্যানেল। এর মধ্যে আছে প্রধান খাল (৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ), মেজর সেকেন্ডারি খাল (৭৪ কিলোমিটার), শাখা খাল (২১৫ কিলোমিটার), উপশাখা খাল (৩৮৮ কিলোমিটার) এবং নিষ্কাশন খাল (৩৮০ কিলোমিটার)। 

তিস্তা সেচের সুবিধাভোগী কৃষকরা অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে জানান, তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু হবার পর থেকে সিলটাপ ডেজিং করা হতো বিদেশ থেকে নিয়ে আসা ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে। এতে সিলটাপের গভীরতা ও ক্যানেলের পানি সরবরাহ ভাল হতো। অথচ গত তিন/চার বছর থেকে সেই ড্রেজার মেশিন নস্ট হয়ে পড়ে আছে। ফলে কৃষকরা দেখেছেন ২০২০-২১ অর্থ বছরে নদী খাল পুকুর খনন প্রকল্পের আওতায় সিলটাপ সহ ৪টি পুকুর খনন কাজ করেছে বোমা মেশিন বসিয়ে। এবারও চলতি মৌসুমে বোরো ধান আবাদে আগামী ১৫ জানুয়ারি থেকে সেচ কার্যক্রম শুরু হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সেচ দিবে ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে। কিন্তু সিলটাপ ভরাট থাকায় ড্রেজার মেশিন ছাড়াই তড়িঘড়ি করে বোমা (শ্যালো) মেশিনের মাধ্যমে খনন করা হচ্ছে। এতে সিলটাপ পরিপূর্ণভাবে খনন হচ্ছে না বলে জানান কৃষকরা। 

ওই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাইকি বিল্ডার্সের প্রোপাইটর এএইচএম সাইফুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বোমা মেশিন ব্যবহারের কোনো বৈধতা নেই। আইন অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। তবে অনেক সময় জরুরি প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি ব্যবহার করতে হয়। কত টাকায় এই কাজ করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আপনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জেনে নিন। তবে নির্দিষ্ট কোনো টাকার পরিমাণ ঠিক করা হয়নি।

এ ব্যাপারে বাপাউবোর উত্তরাঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান এর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে সিলটাপ খনন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি জানান, তিন বছর ধরে ড্রেজার মেশিন নষ্ট। বিদেশ থেকে ড্রেজার মেশিন আনতে কয়েক দফায় ট্রেন্ডার করা হয়। সেটি বাতিল হলে গত বছর (২০২৪) পুনরায় ট্রেন্ডার করা হয়েছে। 

তিনি আরও জানান, যেহেতু ড্রেজার মেশিন নষ্ট তাই বিকল্প পদ্ধতিতে (বোমা মেশিন) জরুরিভাবে সিলটাপ খনন করা হচ্ছে। তবে এভাবে সম্পূর্ন সিলটাপ খনন সম্ভব নয়। তাই প্রাথমিকভাবে ২৫০ মিটার এলাকা খনন করা হচ্ছে। কারণ সামনে ইরিগেশন (বোরো ধান) এ সেচ দিতে হবে আগামী ১৫ জানুয়ারি থেকে। এই খননে বরাদ্দ কত জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো বরাদ্দ নেই। জরুরিভাবে ঠিকাদার নিয়োগ করে খনন কাজটি করা হচ্ছে। বরাদ্দ এলে ঠিকাদারকে হিসাব করে অর্থ প্রদান করা হবে।

তিন বছর ধরে বাপাউবোর ড্রেজার মেশিন নষ্ট। তাই শ্যালো চালিম বোমা মেশিন দিয়ে তিস্তা ব্যারাজের সেচ প্রকল্পে সিলটাপ খনন কাজ হচ্ছে। বুধবার তিস্তা ব্যারাজ থেকে তোলা ছবি-দেশ রূপান্তর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত