ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল প্রকল্পে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া বাদী হয়ে গতকাল রবিবার বিকেলে দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এ মামলা করা হয়। দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইন অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়ায় সত্ত্বেও পরস্পর যোগসাজশ করে পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পের ২৭ নম্বর কূটনৈতিক সেক্টরের ২০৩ নম্বর রোডের ১০ কাঠা আয়তনের ছয়টি প্লট বরাদ্দ নেন। এর মধ্যে ১৭ নম্বর প্লটটি সায়মা ওয়াজেদ নামে বরাদ্দ নিয়েছেন। সায়মা ওয়াজেদ প্লটের দখলসহ রেজিস্ট্রেশনমূলে প্লট গ্রহণ, প্রতারণামূলক অবৈধ পারিতোষক গ্রহণ ও প্রদান, অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ এবং বেআইনি কার্যকলাপের মাধ্যমে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করায় দ-বিধি ১৮৮৬-এর ১৬১/১৬৩/১৬৪/৪০৯ /১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলাটি করা হয়। মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, রাজউকের বিধিবিধান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোনো ব্যক্তির নিজ নামে বা তার স্ত্রী/স্বামীর নামে তার ওপর নির্ভরশীল সন্তানের নামে বা অন্য কোনো নির্ভরশীল ব্যক্তির নামে রাজউক, সরকারি হাউজিং এস্টেট অথবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে খাস জমি বরাদ্দ করা হয়ে থাকলে অথবা রাজউকের আওতাধীন এলাকায় কোনো ব্যক্তির নামে ঘরবাড়ি থাকলে তার নামে প্লট বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। এজন্য তাদের প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা একটি হলফনামা দাখিল করতে হবে।
দুদকের অনুসন্ধানকালে দেখা গেছে, শেখ হাসিনার নামে রাজউকের এখতিয়ারভুক্ত এলাকা ধানমন্ডির ৫ নম্বর রোডে ৫৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাড়ির রয়েছে। এ ছাড়া তার গুলশানে অকৃষি জমি রয়েছে। তাদের নামে রাজউকের এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় বাড়ি থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছয়জনের নামে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন।
মামলার আসামিরা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকার, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিন, সাবেক শহীদ উল্লাহ খন্দকার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদ, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তম্ময় দাস, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (অব.) ইঞ্জিনিয়ার সামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী, উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. হাফিজুর রহমান ও উপপরিচালক হাবিবুর রহমান, পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম এবং সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম।
দুুদকের তথ্যমতে, গত ২৫ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাসহ তাদের পরিবারের ছয় সদস্যের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে অনুসন্ধানে নামে দুদক। এটি দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় বিষয়টি কমিশন থেকে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। ওইদিন বিকেলে এক ব্রিফিংয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারের বিশেষ ক্ষমতাবলে শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে গণপূর্ত ও রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নিজের ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, বোনের ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপান্তির নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২৭ সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর রোড থেকে ১০ কাঠা করে মোট ৬০ কাঠার ছয়টি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। এসব প্লটের মূল্য ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা। এটি দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় বিষয়টি কমিশন থেকে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়।
অন্যদিকে, গত ১৭ ডিসেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, বোন শেখ রেহানা ও ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুদক।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ৫৯ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছে দুদক। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ অগ্রাধিকারের আটটি প্রকল্পে ২১ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছে কমিশন। কমিশন এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৯০ হাজার কোটি দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধানে নামে দুদক। এরপর গত ২২ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি।
