মহামারীর ঝুঁকি নেই এইচএমপিভিতে

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৩:১৬ এএম

বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়া এইচএমপিভি (হিউম্যান মেটানিউমো ভাইরাস) নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, এই রোগের মহামারী হওয়ার ঝুঁকি নেই। এজন্য সীমান্তে সতর্কতার কিছু নেই। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রস্তুতি আছে।

গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় ডা. সায়েদুর এসব কথা বলেন।

এর মধ্যে গতকাল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এ ছাড়া দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে কাজ শুরু করেছে মেডিকেল টিম।

অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এইচএমপি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাধারণ ভাইরাস জ¦রের চিকিৎসা দিতে হবে।  তিনি আরও বলেন, এইচএমপিভি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। এমনকি এই ভাইরাস সম্পর্কে বিজ্ঞানের যতটুকু জানা আছে, সে অনুযায়ী এটি দিয়ে বড় ধরনের মহামারী হওয়ার ঝুঁকিও নেই।

এই বিশেষ সহকারী বলেন, যারা একটু অসুস্থ তারা একটু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। যাদের এইচএমপি ভাইরাস শনাক্ত হবে তারা সাধারণ ফ্লুর চিকিৎসা নেবেন। বেশি পানি পান করুন ও পুষ্টিকর খাবার খাবেন। এটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ বা যেখান থেকে রোগটি এসেছে সেই চীনও কোনো সতর্কতা জারি করেনি।

ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘ভাইরাসটি শনাক্তে আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। পরীক্ষার জন্য কিটস সংগ্রহ করেছি। তবে এটি ওই ধরনের কোনো ঝুঁকি নেই। সীমান্তে বিধিনিষেধ আরোপের মতো কোনো কথা ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশনে বলা হয়নি। এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোনো সতর্কবাণী দেয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আজকালের মধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে দেব, যারা চিকিৎসায় গাইডলাইন ঠিক করে দেবেন। তবে প্রটোকলে (বর্তমানে ফ্লু চিকিৎসা পদ্ধতি) বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হবে বলে আশা করছি না। গাইডলাইন তৈরি হলে আমরা সেটি চিকিৎসকদের মধ্যে শেয়ার করব।’

সম্প্রতি চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও ভারতের পর বাংলাদেশেও এই ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। গত ১২ জানুয়ারি এক নারীর শরীরে এই ভাইরাস পাওয়া গেছে। আইইডিসিআর জানিয়েছে, তারা ২০১৭ সাল থেকেই এই ভাইরাস শনাক্তে পরীক্ষা করে আসছে। তখন থেকেই রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এর আগে ২০১৫ সালে এক গবেষণায় ২৬ জন শিশুর শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। এটি সাধারণ ফ্লুর মতো একটি ভাইরাস হওয়ায় সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রচার করেনি।

ভারতে ভাইরাসটি শনাক্তের পর গত ৮ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভাইরাসটি প্রতিরোধে এক সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেয়। সেখানে বলা হয়, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। সেইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন হাঁপানি বা ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য উচ্চঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।

শাহজালাল বিমানবন্দরে সতর্কতা, সাত নির্দেশনা : দেশে এইচএমপিভি শনাক্তের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দিয়েছে বেবিচক। বিমানবন্দর ব্যবহারকারী লোকজন, এয়ারলাইনসগুলো ও বিমানবন্দর স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে এ ব্যাপারে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাতে মাস্ক পরার পাশাপাশি উড়োজাহাজগুলোর বাড়তি সতর্কতা ও ভাইরাসের লক্ষণযুক্ত কাউকে পেলে বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য বিভাগকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।

গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম এক চিঠিতে এ তথ্য জানান। চিঠিতে তিনি লেখেন, হিউম্যান মেটাপনিউমোভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক বা উদ্বেগের কোনো তাৎক্ষণিক কারণ নেই, সচেতনতা বজায় রাখা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অনুসরণ করলে এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব স্টেকহোল্ডারকে হিউম্যান মেটাপনিউমোভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

স্টেকহোল্ডারদের জন্য নির্দেশনাগুলো হচ্ছে প্রয়োজনে বিমানবন্দর প্রাঙ্গণে সব যাত্রী, কর্মী এবং দর্শনার্থীকে ফেস মাস্ক এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারে উৎসাহিত করা। জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্টের মতো এইচএমপিভির যেকোনো লক্ষণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে শাহজালালের স্বাস্থ্য বিভাগে রিপোর্ট করা।

বিমান সংস্থাগুলোর জন্য নির্দেশনা : ভ্রমণের উৎসস্থলে, বিশেষ করে সন্দেহভাজন দেশগুলো থেকে আগত ফ্লাইটগুলোর জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা; যদি কোনো যাত্রীর মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয় অথবা ফ্লাইটে কোনো সন্দেহজনক রোগী থাকে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে শাহজালালের স্বাস্থ্য ইউনিটকে অবহিত করা; কেবিন ক্রু এবং যাত্রীরা নির্দেশিকা সম্পর্কে অবগত আছেন কি না তা নিশ্চিত করা।

স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য নির্দেশনা : সন্দেহজনক লক্ষণযুক্ত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা। এসব বিষয় নিশ্চিত করার জন্য স্টেকহোল্ডারদের সহায়তা ও তথ্য প্রদান করতে বলা হয় চিঠিতে।

চিঠিতে আরও লেখা হয়, রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (সিডিসি) পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই ভাইরাস ফ্লুর মতো অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতার মতো লক্ষণ সৃষ্টি করে, যা সাধারণত ২-৫ দিনের মধ্যে সমাধান হয়ে যায়। অতএব, আসুন আমরা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকি। সবাইকে স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুসরণ করার এবং নিরাপদ থাকার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

হিলি চেকপোস্টে কাজ শুরু মেডিকেল টিমের : এইচএমপিভি ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে কাজ শুরু করেছে মেডিকেল টিম। এতে স্বস্তি ফিরেছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাতায়াতকারী পাসপোর্টযাত্রীদের। তবে দুদেশের মধ্যে পণ্য আনা-নেওয়া করা চালক ও সহকারীদের এর আওতায় না আনায় কিছুটা শঙ্কিত স্থানীয়রা।

গতকাল বেলা ১১টা থেকে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে বুথ স্থাপনের মাধ্যমে এই কাজ শুরু করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি মেডিকেল টিম। ভারত থেকে দেশে ফেরা পাসপোর্টযাত্রীদের জ¦র, সর্দি-কাশি, র‌্যাশসহ অন্যান্য উপসর্গ আছে কি না, সেটি নিশ্চিত হওয়ার পরই তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। যদি কোনো যাত্রীর এই ধরনের উপসর্গ পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে হাসপাতালে আইসোলেশনে পাঠানোর কথা জানিয়েছে মেডিকেল টিম।

ভারত থেকে ফেরা পাসপোর্টযাত্রী কিশোর দাস বলেন, ‘বাংলাদেশে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে যেভাবে চেক করা হচ্ছে, এটি খুব ভালো একটা উদ্যোগ।’

হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে কর্মরত মেডিকেল টিমের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার জাহাঙ্গির আলম বলেন, ‘এইচএমপিভি নামের নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এখানে আমরা ভারত থেকে দেশে আসা পাসপোর্টযাত্রীদের স্ক্যানার দিয়ে চেক করা হচ্ছে। যদি কাউকে সন্দেহভাজন মনে হয়, সে ক্ষেত্রে পরবর্তী ব্যবস্থার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হবে।’

হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন এই ভাইরাস এইচএমপিভির সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো নির্দেশনা মেনে চলা হচ্ছে। হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে মেডিকেল টিম স্থাপন করা হয়েছে, যা কাজ শুরু করেছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত