২০১৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর; রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের অস্থায়ী আদালতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার সর্বশেষ ধাপের শুনানি চলছে। আসামি বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তার পক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন (প্রয়াত) মামলার অসঙ্গতি তুলে ধরে নোবেল বিজয়ী বাঙালি সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতার চয়ন উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা যাই বলি না কেন, এ মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণে যাই থাক, মামলার উদ্দেশ্যে হলো যেভাবেই হোক বলতে হবে ‘কেষ্টা বেটাই চোর।’ তার এ উক্তি সেদিন এবং পরেও রাজনীতি ও বিচার অঙ্গনে বেশ আলোচনা ও হাস্যরসের জন্ম দেয়।
গতকাল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে খালাস পেয়েছেন খালেদা জিয়া। এর মাধ্যমে ১৭ বছর সাজা হওয়া দুই মামলার অভিযোগ থেকে মুক্ত হলেন বিএনপির চেয়ারপারসন। আপিল বিভাগ রায়ে বলেছে, ‘এ মামলা ছিল বিদ্বেষপ্রসূত এবং এ রায়ের ফলে খালেদা জিয়াসহ এ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত সবাই তাদের মর্যাদা ফিরে পেলেন।’
আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে মামলা আর কারাবাস ছিল তার প্রায় নিত্যসঙ্গী। অবশেষে খালেদা জিয়া অনেকটাই ভারমুক্ত হলেন। গত কয়েক বছরে মামলা, সাজা, কারাবাস, বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে নানা নাটকীয়তা, ঘটনার শেষে গত ৭ জানুয়ারি লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার জন্য যান খালেদা জিয়া।
বিএনপির শীর্ষ আইনজীবীরা জানান, ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় থেকে আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রথম ১০ বছরে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে হত্যা, নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ, দুর্নীতি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, মানহানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৩৭টি মামলা হয়। হত্যার তিনটি, নাশকতার ১৬টি, দুর্নীতির পাঁচটি ও মানহানির ৪টি মামলা। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রদ্রোহ, নাশকতাসহ ২০টি’র বেশি মামলার কার্যক্রম বাতিল করেছে হাইকোর্ট। এখন পর্যন্ত দুর্নীতির চারটি মামলায় খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। নাইকো দুর্নীতি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে ঢাকার একটি আদালতে। অন্য মামলাগুলোর কিছুতে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে, কিছু বিচারের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
যে দুই মামলায় সাজামুক্ত:
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়। এরপর থেকে তাকে রাখা হয় নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। আপিল শুনানির পর ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর তার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে হাইকোর্ট। প্রায় সাত বছর পর গতকাল এ মামলায় আপিল বিভাগের রায়ে খালাস পেলেন তিনি।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধভাবে লেনদেনের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় করা একটি মামলায় ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ ও অর্থদণ্ড দেয় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫। আপিলের পর গত বছরের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে তাকে খালাস দেয়।
অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের পর দুই বছরের বেশি কারাবাস করেন খালেদা জিয়া। ২০২০ সালের মার্চে করোনার প্রকোপের সময় সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত হলে তিনি কারাবাস থেকে মুক্তি পান। গণ অভ্যূত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে জিয়া অনফানেজ ট্রাস্ট মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা মওকুফ করা হয়। দুই মামলায় ১৭ বছরের সাজা মওকুফের আপিলের যুক্তিতে তার আইনজীবীরা বলেন, খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়েছে আইন ও আদালত। তিনি আইনের শাসনে বিশ্বাসী এবং আইনিভাবে মোকাবেলা করেই খালাস পেতে চান।
গত ২৭ নভেম্বর বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলটির তিন শীর্ষ নেতাকে অব্যাহতি দিয়ে চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত। এর আগে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় গত বছরের ২৪ অক্টোবর খালেদা জিয়াসহ তিন নেতাকে অব্যাহতি দিয়ে ১২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সংশ্লিষ্ট আদালত। দুটো মামলা দায়ের হয়েছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়।
খালেদা জিয়াসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর দায়ের হওয়া নাইকো দুর্নীতি মামলায় এখন পর্যন্ত ৩৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। আগামী ২১ জানুয়ারি এ মামলার শুনানি রয়েছে। এ মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন বা অন্যদের ন্যুনতম সংশ্লিষ্টতা নেই। কোনো সাক্ষী খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করেননি। আশা করি, এ মামলায় তিনি খালাস পাবেন।’ বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে মামলাগুলোতে বিএনপির চেয়ারপারসনের সাজা হয়েছিল তার দুটোতেই তিনি খালাস পেয়েছেন। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা তাকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্যই সাজার ব্যবস্থা করেছিলেন।’
তারেক রহমানের বাকি আরও ২ মামলা:
বিএনপির শীর্ষ আইনজীবীরা জানান, গত ১৭ বছরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা, দুর্নীতি, মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে ৮০টির বেশি। পাঁচটি মামলায় যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে ছয় ধরণের সাজা হয়েছে তার। প্রতিটি মামলায় তাকে পলাতক দেখিয়ে সাজা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট আদালত। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তত ৪৫টি মামলায় খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ২১ আগস্ট হত্যা মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং একই ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলায় তাকে ২০ বছর কারাদণ্ড দিয়েছিল ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে গত বছরের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট অন্য আসামিদের সঙ্গে অভিযোগ ও সাজা থেকে তারেক রহমানকেও খালাস দেয়।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত। হাইকোর্টেও এ সাজা বহাল থাকে। গতকাল আপিল বিভাগ এ মামলায় অধস্তন আদালত ও হাইকোর্টের সাজা বাতিল করেছে। ফলে এ মামলার অভিযোগ থেকে তিনি খালাস পেলেন।
এছাড়া ২০১৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কটুক্তির অভিযোগে মানহানির একটি মামলায় ২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের একটি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তারেক রহমানকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিতীয় আদালত মামলাটি খারিজ করে দিলে খালাস পান তিনি।
যে দুই মামলা নিস্পত্তির প্রতীক্ষায়:
অর্থপাচারের একটি মামলায় ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত তারেক রহমানকে খালাসের রায় দেয়। দুদকের এ মামলায় তার বন্ধু ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে দেওয়া হয় সাত বছরের কারাদণ্ড। অধস্তন আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে দুদক। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ২১ জুলাই তারেক রহমানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়। গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের পক্ষে গত ১০ ডিসেম্বর আপিল হলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তারেক রহমান ও গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সাজা স্থগিত করে আপিলের অনুমতি দেয়। এ মামলায় আপিলের ওপর শুনানি হবে। ২০২৩ সালের ২ আগস্ট জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের একটি মামলায় তারেক রহমানকে ৯ বছর ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানকে তিন বছর কারাদণ্ড দেয় বিশেষ জজ আদালত। তারা হাইকোর্টে আপিল করলে মামলাটির নিষ্পত্তি হবে। তার আগে বিচারিক আদালতে এসে তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে।
এ বিষয়ে বিকল্প আইনি চিন্তা হিসেবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা নিয়ে আলোচনা রয়েছে দলটির শীর্ষ আইনজীবীদের মধ্যে। কিছুদিন আগে দলের একজন শীর্ষ আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘এ বিধানে সাজা স্থগিতের সুযোগ রয়েছে। এটি হলে পরে আপিল করে মামলার আইনি মোকাবেলা করা যাবে। বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের প্রতি আস্থাশীল। তিনি মনে করেন, তার নামে যত মামলা আছে সেসব মিথ্যা ও বানোয়াট। দেশের সংবিধান ও প্রচলিত ফৌজদারি আইন পর্যালোচনা করে আপিল ও আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
সাবেক ৩১ এমপির গাড়ি নিলামে
বৃহস্পতিবার মুক্ত হচ্ছেন বাবর
হাজিদের সেবায় অনন্য এক বাংলাদেশি
বাংলাদেশ-ভারত-চীন : উত্তেজনার লাভ-ক্ষতি
যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত ইসরায়েল-হামাস