সৌদিতে বাংলাদেশিদের হজ ও ওমরাহ পালনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন হাফেজ জিয়াউর রহমান। ইতিমধ্যে তিনি বীনা ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ও ক্যাটারিং সার্ভিস কোম্পানির মাধ্যমে সৌদি সরকারের নজর কেড়েছেন। আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশের হজ-ওমরা এজেন্সি মালিকদের কাছে। আগামী হজের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহসান সিরাজ
দেশ রূপান্তর : বীনা ইন্টারন্যাশনালের কার্যক্রম কী?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : বীনা ইন্টারন্যাশনাল ‘আল দিয়াফাহ’ গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। যা বাংলাদেশ থেকে আসা হজ ও ওমরাহহ পালনকারীদের সেবা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গত বছর আমাদের হাজি ২৮ হাজার থাকায় আমরা সাতটি মক্তব (সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান) নিয়ে কাজ করেছি। বাংলাদেশের প্রায় ৯০টি হজ এজেন্সিকে সেবা দিয়েছি। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে গত বছর প্রায় তিন লাখের অধিক ওমরাহহ’র হাজি এসেছেন। এর মধ্যে আমরা ভিসা দিয়েছি প্রায় দেড় লাখের অধিক হাজিকে। হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের উত্তম সেবা দেওয়ার জন্য বীনা ইন্টারন্যাশনালে রয়েছে প্রায় দুইশর কাছাকাছি কর্মী। এর মধ্যে বাংলাদেশের কর্মী শতাধিক। এছাড়া ভারত-পাকিস্তানসহ সাতটি দেশের জনবল কাজ করে আমাদের সঙ্গে। হজের সময় অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি কাজ করে। এ সবের মধ্যে বাংলাদেশিদের সবসময়ই প্রাধান্য দেওয়া হয়। কারণ এতে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যায়, যাতে বাংলাদেশ লাভবান হয়।
দেশ রূপান্তর : আপনি বাংলাদেশের ওমরাহ যাত্রীদের নিয়ে কেন ভাবলেন?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : ২০১৫ সালে আমাদের দেশের কিছু অসাধু-লোভী ওমরাহ ট্রাভেল ব্যবসায়ীর কারণে বিভিন্ন কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়। তারা ওমরাহতে এমন লোকদের পাঠাতেন যারা এসে আর ফেরত যেত না। এজন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে সৌদির কোনো ওমরাহ কোম্পানি কাজ করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তখন আমাদের দেশের ওমরাহ প্রত্যাশীদের আসা প্রায় একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় বাংলাদেশি ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর জন্য ওমরাহর কাজ করা সহজ ছিল না। তখন আমি উদ্যোগ নিয়ে সৌদির বীনা কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের হয়ে বীনা ইন্টারন্যাশনাল নাম দিয়ে চুক্তি করি। তখন বাংলাদেশের প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ট্রাভেল এজেন্সি আমাদের সঙ্গে ওমরাহর কাজ করার চুক্তি করে। ফলে আবার বাংলাদেশের ওমরাহ কার্যক্রম শুরু হয়।
দে রূপান্তর : সৌদিতে হজ কার্যক্রমের সঙ্গে কবে যুক্ত হলেন?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : আমি ১৯৯৭ সাল থেকে হজের কাজ শুরু করি। ১৪৪৪ হিজরি অর্থাৎ ২০২৩ সালে ভাবলাম, হজের সময় যেসব হাজি বাংলাদেশ থেকে আসেন তারা হজের মূল অংশে সৌদি মক্তবের (সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান) অধীনে থাকায় ভাষা না জানা এবং খাবারের ভিন্নতায় তাদের অনেক কষ্ট হয়। এজন্য ২০২৩ সালে এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হই।
দেশ রূপান্তর : হজ কার্যক্রমে কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং কেমন সাড়া পেলেন?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : ২০২৩ সালে আমরা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হাজির সেবা দিয়েছি। ২৪ সালে সেটা বেড়ে ২৮ হাজার হয়ে যায়। কাজ শুরু করেই আমরা বড় একটি সফলতা অর্জনে সক্ষম হই। সেই প্রেরণা ও অভিজ্ঞতা থেকে ২০২৪ সালের হজ নিয়ে একটি মাইলফলক ঠিক করি এবং প্রস্তুতি নিই। কিন্তু সৌদি সরকার এ বছর এসে কিছু নতুন নিয়মকানুন তৈরি করে। যার মধ্যে রয়েছে নুসুক সিস্টেমের কার্ড, মিনার জোন ও তাঁবু নির্ধারণ, পরিবহন-ট্রাফিক সিস্টেমসহ সব কার্যক্রমে রয়েছে নতুন পদ্ধতি, যা আগের নিয়মের পুরোপুরি উল্টো। এতে আমাদের সম্পূর্ণ প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিরাট বিড়ম্বনায় পড়ে যাই। তাৎক্ষণিকভাবে এটা থেকে উত্তরণের জন্য সব এজেন্সি মালিক, গ্রুপ লিডার এবং আমাদের বীনার কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হাজিদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি আমরা।
দেশ রূপান্তর : হাজিদের পরিবহন নিয়ে কেন মাঠে নামলেন?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : সৌদিতে আমিই একমাত্র বাংলাদেশি, যার হজ-ওমরাহ মন্ত্রণালয় এবং ট্রান্সপোর্ট মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক অনুমোদিত নিজস্ব লাইসেন্স করা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি আছে। বাংলাদেশি হজ ও ওমরাহযাত্রীদের ভালো সার্ভিস দিতে হলে নিজস্ব যানবাহন ছাড়া সেটা সম্ভব না। নিজস্ব যানবাহন থাকলে সর্বোচ্চ ভালো সার্ভিস দেওয়া সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই পরিবহন সার্ভিস নিয়ে আসা।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশি হাজিদের খাবার সরবরাহের চিন্তা কীভাবে এলো?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : আসলে হজের সময় সৌদি মুয়াল্লিমের পক্ষ থেকে হাজিদের যে খাবার সরবরাহ করা হয় সেটা আমাদের দেশের মানুষের জন্য মুখরোচক নয়। অধিকাংশ হাজিই সেটা খেতে পারেন না। প্রচুর খাবার নষ্ট হয়ে যায় তখন। আমি চেষ্ট করলাম হাজিদের মুখরোচক খাবারের আয়োজন করতে। এ খাবারে হাজিরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বেশি। আলহামদুলিল্লাহ, সৌদি সরকার অনুমোদিত প্রায় চল্লিশ হাজার হাজির খাবার পরিবেশনের জন্য বীনা ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানির নিজস্ব লাইসেন্সে ৪টি কিচেন রয়েছে।
দেশ রূপান্তর : হজ ও ওমরাহ নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : পরিকল্পনা হলো, হাজিদের সেবার জন্য যে গাড়িগুলো রয়েছে সেগুলো আমাদের সামর্থ্যরে আলোকে বৃদ্ধি করা। যাতে হাজিদের চলাচলে সুবিধা হয়। পাশাপাশি আমাদের ক্যাটারিং সার্ভিসের মান আরও উন্নত করা। মক্কা মদিনায় আবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এজেন্সিদের চাহিদা অনুযায়ী পরামর্শের মাধ্যমে সৌদি সরকারের সঙ্গে কাজ করা। পাশাপাশি বাংলাদেশি ট্রাভেল এজেন্সিদের এসব আবাসন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ সরকার হজের দুটো প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর বাইরে কেউ যদি বাড়তি সুবিধা ভোগ করতে চান তাদের কোনো সুযোগ আছে কি?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : মূলত বাংলাদেশের হাজিরা ডি ক্যাটাগরির সার্ভিস গ্রহণ করেন। এছাড়া হজের ভিআইপি ক্যাটাগরির হাজিরাও এজেন্সিগুলোর কাছে আসেন। হাজিদের কেমন সেবা দেওয়া হবে সেটা তারাই ঠিক করবেন। এর জন্য এজেন্সিগুলোকে কাজ করতে হয়। এজেন্সি মালিকরা আমাদের কাছে এলে আমরা ভিআইপিদের জন্য ভিআইপি হোটেল, গাড়ি, মিনার তাঁবু ও খাবারসহ সম্পূর্ণ সেবা দিতে চেষ্টা করি।
দেশ রূপান্তর : আগামী হজের প্রস্তুতি কেমন?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : আলহামদুলিল্লাহ, ১৪৪৬ হিজরি সেশনের পবিত্র হজের জন্য আমরা সৌদির ফ্লাইনাস কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। কয়েকটি হজ কোম্পানির সঙ্গে মিটিং শেষে হাজিদের সর্বোচ্চ সার্ভিসের নিশ্চয়তা পেয়ে ফ্লাইনাস কোম্পানির ‘জোন ৫’-এ ২০ হাজার হাজি এবং ‘জোন ১’-এ ভিআইপি দেড় হাজার হাজির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। ফ্লাইনাস কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার যিয়াদ সাঈদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়। আমাদের নিয়ত এবং আল্লাহর সাহায্যে আমরা সর্বোচ্চ সার্ভিস দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছি। আশা করছি, হাজি সাহেবরা আমাদের সার্ভিসে সন্তুষ্ট হবেন ইনশাআল্লাহ।
দেশ রূপান্তর : অনেক হজ ও ওমরাহযাত্রী সৌদিতে এসে বিড়ম্বনার শিকার হন। তাদের বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?
হাফেজ জিয়াউর রহমান : অনেকেই ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে ভালোভাবে চুক্তি না করার কারণে বিড়ম্বনার শিকার হন। কারও সঙ্গে আসার আগে বিস্তারিত জেনে-বুঝে চুক্তি করলে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। অনুরোধ থাকবে কম টাকায় কেউ যেন হজ-ওমরাহতে না আসেন। অল্প টাকার ব্যবধানে এদের সমস্যাগুলো বেশি হয়।
