অবৈধ আহরণে হুমকিতে মৎস্যভাণ্ডার

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৫:৩৫ এএম

গত কয়েক বছর ধরে আশানুরূপভাবে সাগর ও নদী মোহনায় মিলছে না ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছ। এর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে মৎস্য গবেষকরা দায়ী করলেও জেলে-ব্যবসায়ীরা তুলে ধরছেন ভিন্ন তথ্য। অনুমোদনহীন জলযানের ব্যবহার, নিষিদ্ধ জালে মাছ শিকার, উপকূল জুড়ে ভূলা চিড়িংসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা আহরণ, অবাধে ছোট মাছ শিকার এবং বিদেশি জেলেদের আগ্রাসনকে এজন্য দায়ী করেছেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, সামুদ্রিক ও নদীর মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে এখনই মৎস্য আইনের কঠোর প্রয়োগসহ বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে মৎস্য বিভাগকে। অন্যথায় অচিরেই দেখা দেবে মাছের আকাল। বাড়বে আমদানিনির্ভরতা, যা দেশের প্রবৃদ্ধিকে ফেলবে সংকটে।

আমিষের চাহিদা মেটাতে দেশের চাহিদার ৭০ ভাগ মাছের জোগান আসে বঙ্গোপসাগর থেকে। সাগরে এই মাছ শিকারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন পটুয়াখালী উপকূলের প্রায় ৬৭ হাজার জেলে। গড়ে উঠেছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা-মহিপুর-আলীপুরে দেশের বৃহৎ সামুদ্রিক মাছের আড়ত, শুটকি পল্লী ও দেশের বৃহৎ সামুদ্রিক মাছের মৎস্য মার্কেট। তিন হাজারেরও বেশি ট্রলার মালিক, আড়তদারের কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে এ খাতে কর্মরত রয়েছে দৈনিক মজুরির অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক।

কিন্তু গত এক দশক ধরে সাগর ও মোহনাসংলগ্ন মৎস্য অভয়াশ্রমখ্যাত নদীতে চলছে মাছের আকাল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, বড় অঙ্কের বাজেটের বাজার ও রসদসামগ্রী নিয়ে গভীর সাগরে গিয়ে জাল ফেলে জেলেরা ফিরছে অনেকটাই খালি হাতে। যে মাছ পাচ্ছেন তাতে অনেকেরই উঠছে না জ্বালানিসহ বাজার খরচ। মাছের এমন আকালে দেনায় জড়িয়ে পড়ছেন জেলে, ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীরা। শ্রমিকরা হারাচ্ছেন জীবিকার নিশ্চয়তা। পরিবহন ও এর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের চলছে দৈন্যতা। বাধ্য হয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন পেশা পরিবর্তনে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নিজামপুর, আশাখালী, কুয়াকাটা, আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দর, রাঙ্গাবালী উপজেলার জাহাজমারা, বড়বাইশদিয়া এলাকার জেলেরা জানান, অবাধে নিষিদ্ধ জালে মাছ শিকার করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক মাছ সম্পদের। ৪০ মিটার গভীরতার বাইরে গিয়ে মাছ শিকার করার কথা থাকলেও মাত্র ১০ মিটার গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ শিকার করছে কিছু বাণিজ্যিক ট্রলার। ৪.৫ মিটার ফাঁসের জাল ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও ব্যবহার করছে এর চেয়ে কম ফাঁসের জাল।

মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের ২৫০টিরও বেশি বাণিজ্যিক ট্রলার বা ট্রলিং বা লংলাইনিং ট্রলারের লাইসেন্স রয়েছে। এসব লাইসেন্সের সুযোগ নিয়ে অনেক মালিক একাধিক বাণিজ্যিক ট্রলারে সমুদ্রে মাছ শিকার করছে। এসব অবৈধ নৌযানের জন্য মামলার বিধান থাকলেও জরিমানার বিধান নেই। ফলে বেপরোয়া এসব ট্রলার মালিকরা সামুদ্রিক মৎস্য আইন-২০২০-এর পাত্তা না দিয়ে চালাচ্ছেন তাদের মাছ শিকার।

এ ছাড়া উপকূল জুড়ে ভূলা চিড়িংসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা আহরণ, অবাধে ছোট মাছ শিকার, অসাধু ব্যবসায়ীদের ইন্ধনে অবরোধকালে কিছু জেলেদের মাছ শিকারের ফলে দিনদিন কমছে সাগর-নদীতে মাছ। বিদেশি জেলেদের আগ্রাসনকেও দায়ী করেছেন অনেক জেলে-ব্যবসায়ীরা। এর থেকে উত্তরণে সামুদ্রিক মৎস্য আইন-২০২০-এর কঠোর প্রয়োগ চাইছেন মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীসহ জেলেরা।

কাসেম, সুলতানসহ নিজামপুরের অনেক জেলে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে অন্তত চার হাজার ট্রলার সাগর উপকূলে ভূলা চিংড়ি ধরছে। ক্ষুদ্রাকৃতির এসব চিংড়ি ধরতে ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল ব্যবহার করা হয়। এতে করে সামুদ্রিক সব মাছের পোনা মেরে ফেলছে। এসব চিংড়ি শিকারিরা ভূলা চিংড়ি রেখে বাকি মাছের পোনা সাগরে ফেলে দিচ্ছে।

মহিপুর মৎস্য বন্দরের আড়তদার মাহাতাব হোসেন বলেন, মাছের আকালের জন্য সবচেয়ে বড় দায়ী ট্রলিং বোট। এদের গভীর সাগরে মাছ শিকার করার কথা। কিন্তু অগভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করে। ২.৫ থেকে ৩.৫ মিটারের নিচের ফাঁসের জাল ব্যবহার করে। গোড়া থেকে বড় সব মাছ ছেকে ধরে নিয়ে যায়।

কলাপাড়া সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়ার একমাত্র পথ রাবনাবাদ ও অন্ধারমানিক নদ। এ দুটি নদীর মোহনায় নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড কিংবা মৎস্য বিভাগের দুটি অস্থায়ী চৌকি টহল স্থাপন করা হলে কমে আসবে অবৈধ নৌযান, অবৈধ জাল, নিষিদ্ধকালে মাছ শিকার। এ ছাড়া দেশের সব মৎস্যবন্দরে সামুদ্রিক সম্পদ আইনের কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য বাড়াতে হবে নৌযান ও স্থলযান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত